চিকিৎসা পেশার নৈতিকতা ও মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের ঠকানোর অভিযোগে চিকিৎসক মোহসেন আলীর লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী এই চিকিৎসক তার নোংরা কাউন্সিল হাউসের একটি কামরায় ‘রসুনের তেল’ এবং ‘ভিটামিন সি’ ইনজেকশন দিয়ে ক্যানসার নিরাময়ের দাবি করতেন। অসহায় রোগীদের কাছ থেকে কয়েক হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী প্রথাগত চিকিৎসা থেকে তাদের দূরে রাখার গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স ট্রাইব্যুনাল সার্ভিস (MPTS)।
তদন্তে জানা যায়, ডাঃ আলী নিজেকে একজন অভিজ্ঞ জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রচারণা চালাতেন। তার বিলানো প্রচারপত্রে লেখা ছিল, “সর্বোত্তম নিরাময়কারী আল্লাহর নামে, আমরা ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি নিরাময়ের লক্ষ্য রাখি।” তিনি রোগীদের বোঝাতেন যে, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) রোগীদের সুস্থ করার পরিবর্তে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে এবং তারা শুধু কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি থেকে টাকা কামাতে চায়।
একজন ভুক্তভোগী ‘রোগী এ’, যিনি প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন, তাকে আলী ফোনে হেসে বলেছিলেন যে এই রোগ নিরাময় করা এতটাই সহজ যে তিনি ব্যর্থ হলে পুরো টাকা ফেরত দেবেন। এই মিথ্যে আশ্বাসে প্রলুব্ধ হয়ে ওই রোগী তাকে ১৫,০০০ পাউন্ড প্রদান করেন।
লেস্টারশায়ার পুলিশ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে এক হাড়হিম করা চিত্র। ডাঃ আলী একটি সেমি-ডিটাচড কাউন্সিল হাউসের ওপরতলায় বাস করতেন, যার নিচতলায় অন্য একটি পরিবার থাকত। সেখানেই একটি নোংরা ঘরে তিনি অস্ত্রোপচার ও ইনজেকশন দেওয়ার কাজ চালাতেন।
ট্রাইব্যুনালে বিশেষজ্ঞরা এই পরিবেশকে ‘নোংরা, অপেশাদার এবং অত্যন্ত অনুপযুক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়: চিকিৎসায় ব্যবহৃত তরল পদার্থগুলো একটি সাধারণ প্লাস্টিকের বক্সে (হাফোর্ডস বক্স) সংরক্ষিত ছিল। জীবাণুমুক্তকরণের কোনো সুব্যবস্থা ছিল না। রোগীর শরীর থেকে ক্যানুলা খোলার সময় রক্ত ছিটকে দেওয়ালে ও মেঝেতে লাগত, যা সংক্রমণের চরম ঝুঁকি তৈরি করত এবং রোগীদের ব্যবহারের জন্য পৃথক কোনো শৌচাগার ছিল না।
ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, আলী তাদের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে অজানা তরল পুশ করতেন। যখন উপাদান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হতো, তিনি ‘ভিটামিন সি’ এবং ‘রসুনের তেলের কথা’বলতেন । এছাড়াও তিনি বিতর্কিত ‘ওজোন থেরাপি’ এবং ‘সোডিয়াম বাইকার্বোনেট’ প্রয়োগ করতেন, যার ক্যানসার নিরাময়ে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একজন মুমূর্ষু নারী রোগীর (রোগী বি) স্বামীর জবানবন্দিতে জানা যায়, যখন চিকিৎসকরা তার স্ত্রীকে জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আলী ১০ থেকে ১২ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে তাকে সুস্থ করার ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’ দেন।
২০১৯ সালে একজন রোগী জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিলে অভিযোগ করার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। যদিও আলী দাবি করেছিলেন যে তিনি ‘ভেষজ প্রাকৃতিক চিকিৎসা’ ও ‘কোরআন-ভিত্তিক নিরাময়’ প্রদান করেন এবং এর জন্য নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই, তবে ট্রাইব্যুনাল তার এই যুক্তি খারিজ করে দেয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারপারসন নেসা শার্কেট তার রায়ে বলেন, “ডঃ আলী জননিরাপত্তার জন্য একটি উচ্চ এবং চলমান ঝুঁকি। তিনি তার পেশাগত অবস্থানের অপব্যবহার করে অসহায় রোগীদের বিভ্রান্ত করেছেন এবং তাদের জীবনকে সংকটাপন্ন করেছেন। এটি চিকিৎসাপেশার মূলনীতির একটি মৌলিক লঙ্ঘন।”
উল্লেখ্য, ২০০৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত থাকার পর তার লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৮ সালে তিনি অবৈধভাবে এই চিকিৎসা চালিয়ে যান। দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তাকে চিরতরে মেডিকেল রেজিস্টার থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
Leave a comment