ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে একটি যাত্রীবোঝাই ফেরি ডুবে যাওয়ার ঘটনায় প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাসিলান প্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় ডুবে যাওয়া ফেরিটিতে ৩৫০ জনের বেশি আরোহী ছিলেন। এ পর্যন্ত অন্তত ১৯১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১৪৪ জন যাত্রী ও নাবিক, যাদের সন্ধানে জোরালো উদ্ধার অভিযান চলছে।
ডুবে যাওয়া নৌযানটির নাম এমভি ট্রিশা কেরস্টিন-৩। ফিলিপাইন কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, ফেরিটি স্থানীয় সময় সোমবার রাতে জাম্বোয়াঙ্গা শহর থেকে সুলু প্রদেশের জোলো দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। নৌযানটিতে মোট ৩৩২ জন যাত্রী এবং ২৭ জন ক্রু সদস্য ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দক্ষিণ মিন্দানাও জেলার কোস্ট গার্ড কমান্ডার রোমেল দুআ জানান, “আমরা এখন পর্যন্ত ১৯১ জনকে উদ্ধার করেছি এবং ১৫টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ১৪৪ জন এখনও নিখোঁজ আছেন। তাদের উদ্ধারে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।” উদ্ধারকাজে কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, স্থানীয় জেলেরা এবং স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নিচ্ছেন।
বাসিলান প্রদেশের মেয়র আর্শিনা লাজা কাহিং-নানোহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এই দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। তিনি উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও শেয়ার করে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তবে বিভিন্ন সূত্রে মৃতের সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য দেখা গেলেও, কর্তৃপক্ষ বলছে চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণে সময় লাগবে।
জরুরি সেবা কর্মী রোনালিন পেরেজ জানান, উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের মধ্যে অন্তত ১৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ১৯১ জনকে উদ্ধার করেছি, কিন্তু কর্মী ও সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।” অনেককে স্থানীয় নৌকা ও অস্থায়ী উপায়ে উদ্ধার করে তীরে আনা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, আবহাওয়া পরিস্থিতি, যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা ভারসাম্যজনিত সমস্যার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, যাত্রাপথে সমুদ্র কিছুটা উত্তাল ছিল। তবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারণ নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নয় কর্তৃপক্ষ।
ফিলিপাইন একটি দ্বীপময় দেশ, যেখানে নৌপথে যাতায়াত সাধারণ ঘটনা। তবে সমুদ্রপথে দুর্ঘটনাও এখানে নতুন নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনঘন ঝড়, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া—এসব কারণে ঝুঁকি থেকে যায়।
দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ নৌদুর্ঘটনা ঘটে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে, যখন ডোনা পাজ নামের একটি যাত্রীবাহী ফেরি একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কারের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ডুবে যায়। ওই দুর্ঘটনায় ৪,৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামুদ্রিক দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমান দুর্ঘটনার পর নিখোঁজদের স্বজনেরা তীরে ভিড় করছেন এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনদের খোঁজের জন্য। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
এদিকে, দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। নৌযানটির লাইসেন্স, যাত্রী তালিকা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও আবহাওয়ার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
Leave a comment