চিকিৎসা নাকি নির্মমতার চরম রূপ? ভারতের উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরের একটি সরকারি হাসপাতাল থেকে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো অমানবিক ও পৈশাচিক অভিযোগ। অভাবের কারণে দাবিকৃত ঘুষের পুরো টাকা পরিশোধ করতে না পারায়, এক মানসিক ভারসাম্যহীন ১৪ বছর বয়সী মুসলিম কিশোরীর সদ্য জোড়া লাগা পা নিয়মিত পরীক্ষার নামে পুনরায় ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক সরকারি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুজফ্ফরনগরের বাসিন্দা রেশমা নামের এক অসহায় মা তাঁর বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়ের ভাঙা পায়ের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়ার কথা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মেয়েটির অস্ত্রোপচারের জন্য রেশমার কাছে ২৫ হাজার রুপি ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ। মেয়ের যন্ত্রণাকাতর মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে ৮ হাজার রুপি জোগাড় করে ডাক্তারকে দিয়েছিলেন ওই মা। কিন্তু চরম আর্থিক অনটনের কারণে বাকি ১৭ হাজার রুপি দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। বাকি টাকা না পাওয়ায় কিশোরীটির চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও দেরি কহতে থাকে।
নিরুপায় হয়ে রেশমা শেষমেশ জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। পুরো বিষয়টি জানার পর মুজফ্ফরনগরের জেলাশাসক (ডিএম) অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে পদক্ষেপ নেন। তিনি জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে (সিএমও) কড়া নির্দেশ দেন, যাতে ওই দরিদ্র পরিবারটির কাছ থেকে কোনো রকম টাকা না নিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কিশোরীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। জেলাশাসকের এই নির্দেশের পর রেশমা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি আর কোনো বাড়তি টাকা দিতে পারবেন না। সরকারি নির্দেশ মেনে চিকিৎসা করতে বাধ্য হলেও, ঘুষের বাকি টাকা হাতছাড়া হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছিলেন ওই চিকিৎসক।
কিশোরীর মায়ের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের কিছুদিন পর ফলো-আপ বা নিয়মিত পরীক্ষার বাহানা করে ওই কিশোরীকে নিজ চেম্বারে ডেকে পাঠান অভিযুক্ত চিকিৎসক। পরীক্ষা করার নামে তিনি মেয়েটির সদ্য জোড়া লাগা পায়ে চরম হিংস্রতার সাথে গায়ের জোরে মোচড় দেন এবং হাঁটু বাঁকানোর চেষ্টা করেন। রেশমা জানান, চিকিৎসকের সেই নির্মম টানাটানির সময় মেয়ের পা থেকে হাড় ভেঙে যাওয়ার স্পষ্ট ‘মট’ শব্দ শুনতে পান তিনি। ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটি। এই ঘটনার পর থেকেই কিশোরীটির শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং তার পা আবারও গুরুতরভাবে জখম হয়।
এই পৈশাচিক ঘটনার পর রেশমা অবিলম্বে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জানালেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কোনো উপায় না দেখে, অসহায় মেয়েটিকে কোলে নিয়ে পুনরায় জেলা কালেক্টরেটে হাজির হন এবং দোষী চিকিৎসকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই উত্তরপ্রদেশের স্বাস্থ্য মহলে শোরগোল পড়ে গেছে। এই বিষয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (সিএমও) সুনীল তিওয়ারি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কেবল একপক্ষের কথা শুনে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না। পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে একটি বিশদ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে।” তিনি স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন যে, তদন্তে যদি চিকিৎসকের গাফিলতি, দুর্নীতি বা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চিকিৎসাকে বলা হয় মহান পেশা। কিন্তু সামান্য কিছু টাকার লোভ এবং সেই লোভ পূরণ না হওয়ায় এক অসহায়, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কিশোরীর ওপর এমন নৃশংস আচরণের অভিযোগ চিকিৎসা ব্যবস্থার পেশাদারিত্ব ও মানবিকতা নিয়েই মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে।
Leave a comment