বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্য বিস্তার ও শক্তির প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে এক চরম আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি। তাঁর দুই মেয়াদের শাসনকালে বিশ্বের অন্তত ১৫টি দেশকে তিনি সরাসরি আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন, সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছেন অথবা সরাসরি সশস্ত্র হামলা পরিচালনা করেছেন। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ১৩টি দেশের মধ্যে প্রায় ১টি দেশ ট্রাম্পের সামরিক আগ্রাসনের তালিকায় রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের (CNN) এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বরাতে এই খবর জানা গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে ২০২৬) প্রকাশিত সিএনএনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বুধবার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর হুমকির তালিকায় নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানকে যুক্ত করেছেন। বৈঠকে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ওমান যদি ইরানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কৌশলগত ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা করে, তবে দেশটিকে মার্কিন বাহিনীর সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে। ওমানকে উদ্দেশ্য করে বৈঠকে ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে বলেন, “ওমান অন্য সবার মতোই আচরণ করবে, অন্যথায় আমাদের তাদের উড়িয়ে দিতে হবে।”
ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আকস্মিক মনে হলেও এটি মূলত তাঁর শক্তির রাজনীতিরই অংশ। ওমান হলো বিশ্বের ১৫তম দেশ, যার বিরুদ্ধে ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্সি চলাকালীন সামরিক বলপ্রয়োগের হুমকি দিলেন।
সিএনএন আরও জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই হুমকি ও প্রত্যক্ষ সামরিক হামলাগুলোর সিংহভাগই ঘটেছে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৬ মাসের মধ্যে, যদিও এর কিছু ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল প্রথম মেয়াদে। চলতি দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের সাতটি দেশে সরাসরি সামরিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই দেশগুলো হলো—ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইয়েমেন।
এই নির্দিষ্ট দেশগুলোর বাইরেও ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে তথাকথিত ‘মাদক পাচারবিরোধী’ অভিযানের নামে প্রায় ৬০টি আন্তর্জাতিক নৌযানে হামলা চালিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী, যাতে ১৯০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সরাসরি হামলা ছাড়াও ট্রাম্প তাঁর চলতি মেয়াদে কানাডা, কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকো, পানামা, ওমান এবং ডেনমার্কের মালিকানাধীন গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প পথ খোলা রেখেছেন। এর আগে তাঁর প্রথম মেয়াদের সময় তিনি মেক্সিকো এবং উত্তর কোরিয়াকেও তীব্র ভাষায় পরমাণু ও সামরিক ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এসব সামরিক পদক্ষেপের ধরন সব ক্ষেত্রে এক ছিল না। ইরাকের মতো দেশে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, দেশের সার্বভৌম সরকারকে নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি যুদ্ধের হুমকি না দিয়ে কূটনৈতিকভাবে বলেছেন, “সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করা যাচ্ছে না।”
তারপরেও সিএনএনের এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, ট্রাম্প কত ঘন ঘন ও অনায়াসে বৈশ্বিক রাজনীতিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি সামনে এনেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প যে ১৫টি দেশকে হুমকি দিয়েছেন বা আক্রমণ করেছেন, সেগুলোতে বিশ্বের প্রতি ১১ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন বাস করে। অর্থাৎ, বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে প্রতিনিয়ত মার্কিন হামলার আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই সামরিক নীতি বিশ্বের ছয়টি জনবহুল মহাদেশের মধ্যে চারটিতে (আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা) সরাসরি বিস্তৃত। এ ছাড়া ইউরোপীয় দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করায় ইউরোপও এর আওতাভুক্ত হয়েছে। সিএনএনের মতে, সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ট্রাম্পের কিছু মন্তব্য কেবল সামরিক হুমকিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মার্কিন সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকে ইঙ্গিত করে। হুমকির তালিকায় থাকা ১৫টি দেশের মধ্যে অন্তত ৫টি দেশকে (কানাডা, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা এবং পানামা খালের কৌশলগত অঞ্চল) তিনি কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা বা সরাসরি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রাসী ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
Leave a comment