বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ভিসা স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র । মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের বরাতে জানা গেছে, ২১ জানুয়ারি থেকে এসব দেশের নাগরিকদের জন্য মার্কিন ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর আবেদনকারীরা পুনর্মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে কোনো মার্কিন ভিসা পাবেন না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট নীতিগত লক্ষ্য রয়েছে তা হলো যেসব বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর সরকারি সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা বা কল্যাণ ভাতা–নির্ভর হয়ে পড়তে পারেন, তাদের প্রবেশ ঠেকানো। সে লক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ৭৫টি দেশের কনস্যুলার অফিসে একটি জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়েছে।
নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ভিসা দেওয়ার বর্তমান যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়াটি পুনরায় নিরীক্ষণ করা হবে। এই পুনর্নিরীক্ষণ চলাকালীন নির্দিষ্ট ৭৫টি দেশের সব ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আবেদন জমা দিলেও তা প্রক্রিয়াধীন না রেখে নাকচ করা হবে—যতক্ষণ না নতুন মানদণ্ড চূড়ান্ত হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াগুলো নতুন করে খতিয়ে দেখছে। তাই আপাতত ৭৫টি দেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে আসা বন্ধ রাখা হবে। মূলত যারা বিদেশি নাগরিক হয়েও আমেরিকার সরকারি ত্রাণ বা সুযোগ–সুবিধার ওপর নির্ভর করতে পারেন, তাদের প্রবেশ ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “কল্যাণ ভাতা ও সরকারি সুবিধা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকাতে অভিবাসন প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই দেশগুলো থেকে অভিবাসন স্থগিত থাকবে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ তালিকায় বাংলাদেশসহ বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার দেশ রয়েছে। তালিকায় আছে: আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বাংলাদেশ, বার্বাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, বার্মা (মিয়ানমার), কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, কোট দিভোয়ার, কিউবা, কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিকা, মিশর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, ম্যাসেডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান এবং ইয়েমেন।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিসা যাচাইয়ে নতুন ও কঠোর নিয়ম প্রয়োগের নির্দেশ দেয়। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা, ইংরেজি শেখার কর্মসূচি, আর্থিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা গ্রহণের সম্ভাবনা থাকলে আবেদন নাকচ করার সুযোগ রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল—ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ কমানো এবং অভিবাসন ব্যবস্থাকে স্বনির্ভরতা–ভিত্তিক করা।
এই স্থগিতাদেশ কার্যকর হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশসহ তালিকাভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীরা নতুন ভিসা পেতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন। বহুজাতিক কোম্পানির কর্মী স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ভ্রমণও ধীর হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক সমন্বয় নয়; বরং অভিবাসন ও সামাজিক ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত। একদিকে দেশটি বৈশ্বিক প্রতিভা আকর্ষণ করতে চায়, অন্যদিকে সরকারি কল্যাণ ব্যয়ের ঝুঁকি কমাতে কঠোরতা বাড়াচ্ছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের পুনর্মূল্যায়ন শেষ হলে নীতিতে সংশোধন আসতে পারে। তবে ততদিন পর্যন্ত ২১ জানুয়ারি থেকে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথ কার্যত স্থগিত থাকছে।
Leave a comment