মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও মা যে সন্তানের পরম আশ্রয়, তার এক জীবন্ত ও করুণ দৃষ্টান্ত তৈরি হলো রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে। প্রমত্তা পদ্মার অতলে বাস তলিয়ে যাওয়ার অন্তিম মুহূর্তে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে ৮ বছরের শিশু সন্তান আলিফকে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে ঠেলে দিয়েছেন মা জ্যোৎস্না বেগম (৩৫)। শিশুটি সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও, গর্ভধারিণী সেই মা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য’ পরিবহনের বাসটি যখন দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে উঠছিল, ঠিক তখনই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা শিশু আলিফ জানায়, সে তার মায়ের কোলেই বসে ছিল। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যাওয়ার সময় মা মুহূর্তের মধ্যে তাকে জানালার সরু পথ দিয়ে বাইরের দিকে ঠেলে দেন। আলিফ অশ্রুসিক্ত চোখে বলে, “বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছিল, মা আমাকে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। আমি সাঁতার কেটে উপরে চলে আসি, কিন্তু আমার মাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।”
নিখোঁজ জ্যোৎস্না বেগমের মা সাহেদা বেগম জানান, জ্যোৎস্না ঢাকার বাইপাইল এলাকায় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ঈদের ছুটি শেষে তিনি নিজেই মেয়েকে বাসে তুলে দিয়েছিলেন। সাহেদা বেগম আহাজারি করে বলেন, “বাড়ি গিয়ে আমি মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। হঠাৎ জ্যোৎস্না বলে উঠল ‘আম্মা বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছে’। এরপর আর কোনো কথা শুনতে পাই নাই। আমার মেয়েটা ফোনে কথা বলতে বলতেই নদীর মধ্যে চলে গেল।” জ্যোৎস্না বেগমের বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার মাছোঘাটা এলাকায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিকেল সোয়া ৫টার দিকে সংঘটিত এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর আলিফসহ মোট ১১ জন যাত্রী সাঁতরে নিরাপদে তীরে উঠতে সক্ষম হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ গতি হারিয়ে গভীর পানিতে তলিয়ে যায়।
বাসটিতে ঠিক কতজন যাত্রী ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, নিখোঁজদের সন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
Leave a comment