প্রেমিকার জন্য প্রায় ৪ কোটি ৫৫ লাখ ৪১ হাজার ৯২৭ টাকা খরচ করেছিলেন সিঙ্গাপুরের এক ব্যক্তি। দামি উপহার, বিদেশভ্রমণ, ফেংশুই বিশেষজ্ঞের পারিশ্রমিক থেকে শুরু করে জীবনবিমার প্রিমিয়াম সবই দিয়েছিলেন নিজের অর্থে। তবে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সেই অর্থই ফেরত চেয়ে সাবেক প্রেমিকার বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য আদালতে হেরে গেছেন ওই ব্যক্তি।
সিঙ্গাপুর হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, চন্দর আগরওয়াল সাবেক প্রেমিকা ফেলিশিয়া লির পেছনে ৪ লাখ ৬৮ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার খরচ করেছিলেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৫৫ লাখ ৪১ হাজার ৯২৭ টাকা। আদালত মনে করেন, আগরওয়াল স্বেচ্ছায় এসব অর্থ খরচ করেছিলেন। এগুলো ঋণ ছিল এমন দাবির পক্ষে তিনি যথেষ্ট প্রমাণও হাজির করতে পারেননি।
লজিস্টিকস কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আগরওয়ালের সঙ্গে সাবেক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট লির পরিচয় হয় ২০১৯ সালে একটি ফ্লাইটে। পরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁরা সম্পর্কে ছিলেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, সম্পর্ক শুরুর আগেও লিকে দামি উপহার দিতেন আগরওয়াল। সম্পর্ক চলাকালে সেই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। বিচারক লি সিউ কিন বলেন, আগরওয়াল লিকে ‘দামি উপহারে ভরিয়ে দিতেন’। এমনকি এসব অর্থ ফেরত দিতে হবে না বলেও তিনি লিকে আশ্বস্ত করেছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। আগরওয়াল সন্দেহ করতে শুরু করেন, লি অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়।
এর কয়েক মাস পর, ২০২৪ সালের মার্চে আদালতে মামলা করেন আগরওয়াল। তাঁর দাবি, সম্পর্ক চলাকালে লি তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সুদমুক্ত ঋণ নিয়েছিলেন। এসব অর্থের মধ্যে ছিল ক্রেডিট কার্ডে ২ লাখ ৬ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারের খরচ, বিদেশভ্রমণে ১ লাখ ২৯ হাজার ডলার, লির অ্যাপার্টমেন্টের জন্য ফেংশুই বিশেষজ্ঞ নিয়োগে ১৭ হাজার ডলার এবং জীবনবিমার প্রিমিয়াম বাবদ ২০ হাজার ডলার।
লি অবশ্য এসব অর্থকে ঋণ হিসেবে স্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য, ভালোবাসা ও স্নেহ থেকেই আগরওয়াল তাঁকে এসব উপহার দিয়েছিলেন।
আদালতও লির বক্তব্যের পক্ষে রায় দেন। বিচারক বলেন, আগরওয়ালের দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথিপত্র নেই। লি কথিত ঋণ নিয়েছেন বা তা ফেরত দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন—এমন কোনো প্রমাণও আগরওয়াল দেখাতে পারেননি।
রায়ে বিচারক বলেন, উপস্থাপিত প্রমাণে স্পষ্ট যে আগরওয়াল লির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন এবং সম্পর্কের সময় তাঁকে দামি উপহার দিয়েছেন। কিন্তু সম্পর্কটি তিক্তভাবে শেষ হওয়ার পর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এরপর লির কাছ থেকে এসব খরচের ‘মূল্য’ আদায় করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন।
বিচারক আরও বলেন, আগরওয়াল যথেষ্ট সম্পদের অধিকারী এবং তাঁর জীবনযাপনও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে লি তাঁর মতো আর্থিক সামর্থ্যের মানুষ ছিলেন না।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, আগরওয়াল দামি কোনো উপহার দেওয়ার কথা বললে লি অনেক সময় খুদে বার্তায় বিস্ময় প্রকাশ করতেন। কখনো কখনো উপহার নিতে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অনীহাও দেখা গেছে।
রায়ের শেষ দিকে প্রেম ঘৃণায় পরিণত হলে তার তীব্রতা কতটা হতে পারে—সে প্রসঙ্গে ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম কংগ্রেভের The Mourning Bride নাটকের একটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন বিচারক। এরপর তিনি বলেন, এমন আবেগ কোনো একটি লিঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অর্থ ফেরত চেয়ে মামলা করার ঘটনা সিঙ্গাপুরে এটাই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে কেকে কাওশিগান নামের এক সিঙ্গাপুরের নাগরিক নোরা তান নামের এক নারীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছিলেন। তাঁর দাবির পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি।
কাওশিগানের দাবি ছিল, তান তাঁর প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তিনি মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছেন এবং তাঁর সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সিঙ্গাপুরের আদালত তাঁর মামলা দুটি খারিজ করে দেন।
পরে তানও কাওশিগানের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। তাঁকে হয়রানি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে যে অর্থ খরচ করতে হয়েছে, সেই অর্থ ফেরত চেয়েছিলেন তিনি।
Leave a comment