মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন বা সাক্ষাৎকারে দেখা না যাওয়ায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন?
সাধারণত আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময় নেতানিয়াহু নিয়মিতভাবে সংবাদমাধ্যমে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার অনুপস্থিতি নজর কেড়েছে অনেকের। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি হয়তো নিহত হয়েছেন অথবা গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই জল্পনা আরও বাড়ে ১৩ মার্চ প্রকাশিত একটি ভিডিও ঘিরে। ভিডিওটি নেতানিয়াহুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা হয়েছিল। এতে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযানের বিষয়ে বক্তব্য দেন।
তবে ভিডিওটির একটি স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে দাবি করা হয়, নেতানিয়াহুর ডান হাতে ছয়টি আঙুল দেখা যাচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী এটিকে “ক্লাসিক এআই ফিঙ্গার গ্লিচ” বলে উল্লেখ করেন এবং ধারণা করেন ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদনা করা হতে পারে।
এই দাবিগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখো মানুষ পোস্টগুলো দেখতে শুরু করে। কিছু ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, যদি ভিডিওটি সত্যিই কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা ইঙ্গিত করতে পারে যে নেতানিয়াহু আহত বা নিহত হয়েছেন এবং তাকে সরাসরি ক্যামেরায় দেখানো সম্ভব হচ্ছে না।গুজবের জেরে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর অফিস কি পুরনো ভিডিও বা ছবি ব্যবহার করে নতুন ভিডিও তৈরি করেছে?
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার ক্যান্ডেস ওউয়েন্সও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি একটি পোস্টে লেখেন, “বিবি কোথায়?”—নেতানিয়াহুর ডাকনাম ব্যবহার করে ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, কেন তার অফিস কথিত “এআই ভিডিও” প্রকাশ করে আবার মুছে ফেলছে, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো এই দাবিগুলোর সত্যতা নিয়ে দ্রুত ফ্যাক্ট-চেক শুরু হয়। এক্স প্ল্যাটফর্মের এআই চ্যাটবট গ্রোক এই দাবিকে ভুল তথ্য হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, নেতানিয়াহুর হাতে স্বাভাবিকভাবেই পাঁচটি আঙুল রয়েছে।
গ্রোকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভিডিওটির যে স্থিরচিত্রে ছয় আঙুল দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয়েছে, সেটি আসলে ক্যামেরার কোণ, হাতের ভঙ্গি এবং আলো–ছায়ার কারণে তৈরি হওয়া একটি অপটিক্যাল ইল্যুশন। অর্থাৎ বাস্তবে অতিরিক্ত কোনো আঙুল নেই।আরেকটি পোস্টের জবাবে গ্রোক জানায়, নেতানিয়াহুর মৃত্যুর যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকিং সূত্র ইতোমধ্যে খণ্ডন করেছে। ব্যবহারকারীদের যাচাইকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজেও বিভিন্ন ধরনের দাবি ছড়ানো হয়েছে। একটি পেজে দাবি করা হয়, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট একটি সংবাদ সম্মেলন থেকে হঠাৎ বেরিয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে আবার ফিরে আসেন—যা নাকি বড় কোনো ঘটনার ইঙ্গিত হতে পারে।তবে এসব দাবির কোনো স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
নেতানিয়াহুর পরিবারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রম নিয়েও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তার ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু সাধারণত এক্স প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকলেও তিনি সর্বশেষ ৯ মার্চ একটি পোস্ট করেন। এরপর থেকে তার অ্যাকাউন্টেও তেমন কোনো নতুন বার্তা দেখা যায়নি।
এদিকে সাংবাদিকদের একাংশ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল বেইত শেমেশ এলাকায়। সেখানে সাম্প্রতিক হামলার ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করতে দেখা যায় তাকে। সেই সময় তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক সংঘাতের সময় তথ্যযুদ্ধও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জোরালো করতে বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল দেখাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে দিতে পারে।মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুকে ঘিরে যে গুজব ছড়িয়েছে, তা এই বৃহত্তর তথ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এদিকে ইসরাইল সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা পুরোপুরি থামেনি।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যাচাইকৃত তথ্যের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধকালীন সময়ে গুজব ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর অনুপস্থিতি ও একটি ভিডিওকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—ডিজিটাল যুগে একটি ছবি বা ভিডিও কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
Leave a comment