শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থামিয়ে দিতে পারেনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি। দুই হাতের কবজি বাঁকা হওয়ায় নিজের মতো করে চলাফেরা করতে পারে না ইয়াসার ইসলাম নিরব। প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে বাবা-মা তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতেন। দৈনন্দিন নানা কাজেও নিতে হয় অন্যের সহযোগিতা। কোনো গৃহশিক্ষকও ছিল না তার। তবু পড়াশোনায় থেমে থাকেনি ইয়াসার। এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
ইয়াসার ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের পলাশতলী গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম ও খাদিজা খাতুনের তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড়। এক বছর বয়সে তার দুই হাতের কবজি অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন মা-বাবা। চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় গেলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তার শারীরিক সীমাবদ্ধতাও।
ইয়াসার একা হাঁটতে পারে না। খাবার খাওয়া, পোশাক পরাসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজেও অন্যের সহযোগিতা নিতে হয় তাকে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
ছেলের পড়াশোনা থামিয়ে দেননি বাবা-মা। কোলে করে বাড়ির পাশের পলাশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান তাকে। প্রাথমিকের পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হয় পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ে। এরপর প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে মা-বাবা তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতেন।
বিদ্যালয়ে ছুটি হলে কখনো বাবা, কখনো মা, আবার কখনো শিক্ষক বা সহপাঠীরা তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। শুরুতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে গ্রামের কেউ কেউ তাকে নিয়ে উপহাসও করতেন। তবে এসব কিছুই দমাতে পারেনি ইয়াসারকে।
পড়ার টেবিলে বসলে যেন সব সীমাবদ্ধতা ভুলে যায় সে। বাম হাতে কলম ধরে একের পর এক পৃষ্ঠা লিখেছে। এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পেয়েছে জিপিএ-৫।
ইয়াসারের বাবা-মা ও শিক্ষকেরা জানান, ভবিষ্যতে এমবিবিএস চিকিৎসক হতে চায় সে। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার স্বপ্ন।
পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ইয়াসার অত্যন্ত মেধাবী। পড়াশোনার প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল। সহপাঠীদের কাছেও সে ছিল প্রিয়। তার স্বপ্ন এমবিবিএস চিকিৎসক হওয়া। দরিদ্র কৃষকের সন্তান হিসেবে স্বপ্ন পূরণে তার সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষক ও এলাকাবাসীও তার পাশে থাকবেন।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শহীদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইয়াসারকে একটি হুইলচেয়ার, নগদ অর্থ ও ফুলের শুভেচ্ছা দেওয়া হয়েছে। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি প্রশংসনীয়। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
ইয়াসারের এই সাফল্যে আনন্দিত তার পরিবার ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গর্বিত এলাকাবাসীও। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে পারে না, ইয়াসারের সাফল্য তারই উদাহরণ।
Leave a comment