নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে গুরুদাসপুর আমলি আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়।
নাটোর জজ আদালতের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আদালতে মিন্টুর পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। তিনি নিজেই শুনানিতে অংশ নেওয়ার অনুমতি চান। আদালত অনুমতি দিলে মিন্টু দাবি করেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ কোনো কিছু যাচাই না করেই তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তিনি সঠিক তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন মিন্টু
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুর বাজারসংলগ্ন একটি ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে হাজির করা হয়। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাতে থানা-পুলিশ মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। রিমান্ড মঞ্জুরের পর তাঁকে আবারও ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিলের মৃত্যু
নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন।
গত ১৪ অক্টোবর রাতে চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন শাকিল। হামলাকারীরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
শাকিলের বাবা রবিউল করিম ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলাতেই মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
শাকিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার হাসপাতালে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাঁদের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সভাপতি। এ সময় তাঁরা মিন্টুকে গ্রেপ্তার এবং শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। এর পরই সোমবার রাতে মিন্টুকে আটক করে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, তাঁর সন্তান এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁকেও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
হামলার বিবরণ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে শাকিলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলি না লাগায় তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এরপর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিল জানিয়েছিলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পরে তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তাঁকে কুপিয়ে আহত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পরপর দুটি গুলির শব্দ শুনেছিলেন তাঁরা। এগিয়ে গিয়ে শাকিলকে দৌড়ে যেতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি তাঁকে ধাওয়া করছিলেন। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরে যেতে দেখেন তিনি। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে শাকিলের চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা
গুরুতর আহত শাকিলকে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নওশিন জাহান সে সময় জানিয়েছিলেন, শাকিলের হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়।
যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ জানান, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর কিডনি কাজ করছিল না। পরে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আহমেদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, পুলিশ কাউকে ছাড় দেবে না।
শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এশার নামাজের পর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
Leave a comment