কানাডায় বসবাসরত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের জন্য সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আগামী কয়েক মাস থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় নাগরিক তাদের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আইনি মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সময়ে কানাডা সরকার নতুন ভিসা প্রদান এবং স্থায়ী বসবাসের (পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি—পিআর) সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে কার্যকর হলে কানাডায় অনথিভুক্ত বা অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
মিসিসাগাভিত্তিক ইমিগ্রেশন পরামর্শক কানওয়ার সেরাহ ব্রিটিশ দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (IRCC)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ১০ লাখ ৫৩ হাজার ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হতে পারে আরও প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার ওয়ার্ক পারমিট।
কানওয়ার সেরাহ বলেন, “যেসব ব্যক্তি ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো ভিসা, স্টাডি পারমিট বা স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন না, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডায় থাকার আইনি অধিকার হারাবেন।” এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি পড়বেন অস্থায়ী বিদেশি কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা।
তার মতে, কানাডার অভিবাসন ইতিহাসে এত বড় সংখ্যক মানুষের একযোগে আইনি মর্যাদা হারানোর ঘটনা নজিরবিহীন। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ অবৈধ অবস্থায় চলে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগেই, ২০২৫ সালের শেষের দিকে আরও অন্তত ২ লাখ ৯১ হাজার মানুষ তাদের বৈধ অবস্থান হারাতে পারেন।
এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে কানাডায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ আইনি মর্যাদা ছাড়া বসবাস করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকেরা। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হবেন ভারতীয় নাগরিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক দশকে কানাডার শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ ভারতীয় অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নির্মাণ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং খুচরা খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে ভারতীয় অস্থায়ী কর্মীদের অবদান উল্লেখযোগ্য। একইভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বড় অংশই আসেন ভারত থেকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে কানাডা সরকার অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। নতুন করে স্টাডি পারমিটের কোটা কমানো, অস্থায়ী কর্মীদের জন্য ভিসা নবায়নের শর্ত কঠোর করা এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত এরই অংশ।
কানওয়ার সেরাহ সতর্ক করে বলেন, “হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিটের মেয়াদও শিগগিরই শেষ হবে। একই সঙ্গে অনেক আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার যদি আগাম পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে আগামী দুই বছরে অনথিভুক্ত অভিবাসীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ভারতীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে অভিবাসন সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে অনেক অভিবাসী কাজ হারানো, আইনি জটিলতা এবং দেশে ফেরার চাপের মুখে পড়তে পারেন।
এ পরিস্থিতিতে অভিবাসন বিশ্লেষকেরা কানাডা সরকারের প্রতি বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, শ্রমবাজারের চাহিদা, শিক্ষাখাতের বাস্তবতা এবং অভিবাসীদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা পুনর্বিবেচনা না করলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
Leave a comment