ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ছয় হাজার মানুষের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA)। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি সংস্থাটির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে; ইরানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া সরকারি হিসাব এর চেয়ে অনেক কম।
সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, তারা ৫,৮৪৮ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে, যাদের মধ্যে ২০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। এছাড়া আরও ১৭ হাজারের বেশি সম্ভাব্য মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরএএনএ। একইসঙ্গে সংস্থাটি বলছে, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ৪১ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ নেয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্লোগান ও সমাবেশ কয়েক দিনের মধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ৮ জানুয়ারি থেকে কয়েক দিন ধরে বড় শহরগুলোর পাশাপাশি ছোট শহরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি জোরালো হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রেখে সরাসরি গুলি চালিয়েছে। এই ইন্টারনেট শাটডাউন টানা বহুদিন ধরে চলেছে বলে জানিয়েছে নেটব্লকস, যা তথ্যপ্রবাহ সীমিত করে প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই কঠিন করে তুলেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো হতাহতের সরকারি হিসাব প্রকাশ করে জানায়, ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছেন। সরকারের ভাষ্যমতে, নিহতদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা “দাঙ্গাবাজদের” হাতে নিহত সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশভিত্তিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে না। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহে বড় বাধা তৈরি হয়েছে, ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে সরে থাকার ইঙ্গিত দিলেও পরে বলেছেন, প্রয়োজন হলে সেটি একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় থাকবে। তিনি ওই অঞ্চলে একটি বড় নৌবহর পাঠানোর কথাও উল্লেখ করেছেন।
এর জবাবে তেহরান ওয়াশিংটনকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যেকোনো আগ্রাসনের “দাঁতভাঙা” জবাব হবে।
বিদেশভিত্তিক ফার্সি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, জানুয়ারির ৮–৯ তারিখের মধ্যে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এই দাবির স্বতন্ত্র যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি বলে এএফপি জানিয়েছে।
এইচআরএএনএ বলছে, তারা একাধিক উৎস, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও নথি যাচাই করে তথ্য সংগ্রহ করছে। তবু সংস্থাটি স্বীকার করেছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় নেতৃত্বের শাসনের বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও সামাজিক বিধিনিষেধের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষের কারণ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেতরের অসন্তোষ ও বাইরের কূটনৈতিক চাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
ইরানের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বিপরীতমুখী তথ্য, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়া কঠিন। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, প্রাণহানির সংখ্যা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিস্থিতির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য স্বাধীন তদন্ত ও তথ্যপ্রবাহের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি—এমনটাই বলছেন পর্যবেক্ষকরা।
Leave a comment