Home আন্তর্জাতিক ইরানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিক্ষোভ, মসজিদে আগুন
আন্তর্জাতিক

ইরানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিক্ষোভ, মসজিদে আগুন

Share
Share

ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে হামলার মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা শুধু সরকারি স্থাপনাই নয়, একটি মসজিদেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে—যা ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে জনরোষের গভীরতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষুব্ধ জনতা তেহরান ও অন্যান্য শহরে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, একদল বিক্ষোভকারী একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়, যা দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসকে ৬০ বছর বয়সী এক নারী প্রত্যক্ষদর্শী নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি নিজ চোখে মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেখেছেন।

এই বিক্ষোভের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—বিক্ষোভকারীদের হাতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের জাতীয় পতাকা দেখা গেছে। এই পতাকা ইরানে রাজতান্ত্রিক শাসনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এবং অনেকের কাছে এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিবাদের প্রতীক। রাস্তায় রাস্তায় এই পতাকার উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আন্দোলনের একটি বড় অংশ শুধু বর্তমান সরকারের নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়।

বিবিসি ফার্সি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, হাজারো মানুষ “খামেনির পদত্যাগ চাই” এবং এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু কামনা করে স্লোগান দিচ্ছেন। ইরানের মতো কড়া নিরাপত্তা ও সেন্সরশিপ-নির্ভর রাষ্ট্রে এ ধরনের প্রকাশ্য স্লোগান অত্যন্ত বিরল এবং তা সরকারের প্রতি জনসমর্থনের ভয়াবহ ক্ষয়কে তুলে ধরে।

সরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত এক সতর্কবার্তায় অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা তাদের সন্তানদের বিক্ষোভে অংশ নিতে না দেন। এতে বলা হয়েছে, রাস্তায় সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে এবং কেউ আহত বা নিহত হলে তার দায় সরকার নেবে না। এই বক্তব্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এতে রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ‘টাইম’ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরানের একজন চিকিৎসক দাবি করেছেন, শুধু রাজধানীর ছয়টি হাসপাতালেই ইতোমধ্যে ২১৭ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। তার মতে, নিহতদের অধিকাংশের শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে, যা নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি গুলি চালানোর ইঙ্গিত দেয়। তবে এই তথ্যের বিষয়ে ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিক্ষোভের মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক দমন নয়, বরং গভীর অর্থনৈতিক সংকট। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বহু ইরানি পরিবার এখন ন্যূনতম প্রয়োজনও মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে বিস্ফোরণে রূপ দিয়েছে।

ইরানের সাবেক কূটনীতিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান আন্দোলন আগের যেকোনো প্রতিবাদের চেয়ে বেশি সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট। লন্ডনভিত্তিক এক ইরানি বিশ্লেষক বলেছেন, “এটি শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নয়, এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈধতার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। তার মতে, বিক্ষোভকারীরা যেভাবে রাজতন্ত্রের পতাকা বহন করছে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পরিস্থিতি গভীর নজরে রাখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ইরানে সহিংসতা ও প্রাণহানির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ইরান সরকারকে সংযম প্রদর্শন ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরান আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক দুর্দশা, রাজনৈতিক দমন এবং জনরোষ একসঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। মসজিদে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা দেখাচ্ছে যে, এই আন্দোলন কেবল শাসকদের নয়, বরং রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও আদর্শিক ভিত্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনিশ্চিত—তবে এটুকু স্পষ্ট, ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক ও নির্ণায়ক মুহূর্তগুলোর একটি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্বাধীনতাবিরোধী অমানুষদের কারখানা: ফজলুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘স্বাধীনতাবিরোধী অমানুষদের কারখানা’ বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক...

শাহজালালে ইমিগ্রেশন সিন্ডিকেট: কোড বললেই ছাড়, আটকে যাচ্ছেন প্রকৃত পর্যটক

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে প্রকৃত ও সাধারণ পর্যটকদের নানা অজুহাতে আটকে হয়রানি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে সংঘবদ্ধ একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে যোগাযোগ...

Related Articles

বিপুল অর্থ ঢেলেও লাভ হয়নি, মাস্কের সমর্থিত অধিকাংশ প্রার্থীই পরাজিত

যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান সিনেটর সিন্ডি হাইড-স্মিথকে...

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেলেন বাংলাদেশি

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের স্টেট সিনেটের ৫ নম্বর আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না...

ইরানে হামলা চালিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচিত হবে না মার্কিন জনমত উপেক্ষা করা: গালিবাফ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশটির সাধারণ ভোটাররা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁদের স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে...

ট্রাম্পের নির্বাচনি পরাজয়ে অস্বস্তিতে নেতানিয়াহু, চাপে ইসরায়েল

  যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির বড়...

;