খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি মেসে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তে পুলিশকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
খুবির ছাত্র বিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি মেসে একজন শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য এবং নিহত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তিনি বলেন, ওই মেসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা থাকেন। অভিযুক্তরা খুবির বর্তমান নাকি সাবেক শিক্ষার্থী, তা নির্দিষ্ট নাম ও তথ্য পাওয়ার আগে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক সালাউদ্দীন আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। কোনো বর্তমান শিক্ষার্থী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাবেক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক পরিচালক বলেন, প্রাথমিক তথ্য ও স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেসে চুরি—খাবার বা মালামাল সরানো—সংক্রান্ত অভিযোগের জেরে ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। তবে এ তথ্য এখনো পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে আজমুলের বাবা কুতুবউদ্দিন বাদী হয়ে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের (খাজা হল) বিপরীতে ইসলামনগর সড়কের মসজিদ গলির একটি মেসে চুরির অভিযোগ তুলে আজমুলকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে আজমুল মেসে মিল না দিয়েও খাবার খেয়েছিলেন। এ নিয়ে ক্ষোভের পর তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তোলা হয়। পরে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় কয়েকজন তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তাকে ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে।
ঘটনাস্থলে আজমুলের মাথার চুল কেটে দেওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। পরে ভবনের নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। রাত দেড়টার দিকে কয়েকজন যুবক তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, আজমুলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কা করা হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
নিহত আজমুল হোসেন নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মসজিদ গলির ওই মেসে ভাড়া থাকতেন।
এদিকে আজমুলের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার সময় তার পরিবারের কাছে ফোন করে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। পরে ওই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আজমুল কীভাবে মারা গেছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তাকে চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়েছিল কি না, মারধরের পর তাকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, নাকি অন্য কোনোভাবে তিনি নিচে পড়ে যান—এসব বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের মধ্যে আগে থেকেই ঝামেলা ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। অন্যের পোশাক ব্যবহারসহ অন্যান্য বিষয়ে তারা অসন্তুষ্ট ছিলেন।’ শনিবার রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানান তিনি।
Leave a comment