Home জাতীয় শাহজালালে ইমিগ্রেশন সিন্ডিকেট: কোড বললেই ছাড়, আটকে যাচ্ছেন প্রকৃত পর্যটক
জাতীয়

শাহজালালে ইমিগ্রেশন সিন্ডিকেট: কোড বললেই ছাড়, আটকে যাচ্ছেন প্রকৃত পর্যটক

Share
Share

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে প্রকৃত ও সাধারণ পর্যটকদের নানা অজুহাতে আটকে হয়রানি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে সংঘবদ্ধ একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা যাত্রীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সহজে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ব্যাংক হিসাব বা বিদেশ ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও নির্দিষ্ট ‘গোপন কোড’ ব্যবহার করে তাঁদের দেশ ছাড়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, এসব যাত্রীর একটি বড় অংশ বিদেশে যাওয়ার পর আর দেশে ফিরছেন না। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যেভাবে চলে সিন্ডিকেটের কারসাজি

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এ চক্রের কার্যক্রম কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রথমবার বিদেশযাত্রা করা ব্যক্তিদেরও দালালদের মাধ্যমে পর্যটক ভিসায় বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।

টাকার বিনিময়ে বোর্ডিং পাস

অভিযোগ রয়েছে, দালালদের সঙ্গে আগে থেকেই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকায় চুক্তি হয়। এরপর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাউন্টার থেকে এসব যাত্রীর বোর্ডিং পাসের ব্যবস্থা করা হয়। পর্যটক ভিসায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হোটেল বুকিং বা পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ যথাযথভাবে যাচাই না করেই বোর্ডিং পাস দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সূত্রগুলোর।

বোর্ডিং পাস সংগ্রহ থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন পার হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে চক্রটির নির্দিষ্ট লোকজন দায়িত্ব পালন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

‘বকুল-শাপলা’ সাংকেতিক শব্দ

ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড বা সাংকেতিক শব্দ বলতে বলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্রগুলোর দাবি, ‘বকুল’, ‘শাপলা’, ‘আম’ ও ‘জাম’সহ বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে চক্রের সদস্যরা নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করেন। এসব শব্দ বলার পর যথাযথ জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই ছাড়াই পাসপোর্টে বহির্গমনের সিল দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে নিয়মিত এসব সাংকেতিক শব্দ পরিবর্তন করা হয় বলেও দাবি সূত্রগুলোর।

বিদেশের ইমিগ্রেশনেও যোগাযোগের অভিযোগ

সিন্ডিকেটের কার্যক্রম শুধু বাংলাদেশের বিমানবন্দরে সীমাবদ্ধ নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। যেসব দেশে যাত্রীদের পাঠানো হয়, সেসব দেশের বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের কিছু ব্যক্তির সঙ্গেও চক্রটির যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা গন্তব্য দেশের বিমানবন্দর থেকে সহজে বের হতে পারেন।

সূত্রগুলোর দাবি, মালয়েশিয়া ছাড়াও থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, চীন, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, লিবিয়া ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে একই কৌশলে লোক পাঠানো হচ্ছে।

অভিযোগের তির ইমিগ্রেশন পুলিশের দিকে

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের কয়েকজন উপপরিদর্শক (এসআই) এ চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাঁদের দাবি, চুক্তিভুক্ত যাত্রীরা কাউন্টারে গিয়ে নির্ধারিত সাংকেতিক শব্দ বললে তাঁদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কোন দিন কোন কাউন্টারে কোন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন, সেই তথ্যও আগেভাগে দালালদের কাছে পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

চক্রটি শনাক্ত করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বলে জানা গেছে। এসব সংস্থার সদস্যরা মাঝেমধ্যে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে নজরদারি চালান।

তবে সূত্রগুলোর দাবি, গোয়েন্দা দলের উপস্থিতির খবর আগেই সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে ওই সময় চক্রটি কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখে অথবা সাংকেতিক শব্দ ও কৌশল পরিবর্তন করে। এ কারণে বারবার চেষ্টা করেও চক্রের সদস্যদের হাতেনাতে ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

ভোগান্তিতে প্রকৃত পর্যটকেরা

অন্যদিকে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা সাধারণ ও বৈধ পর্যটকেরা বিমানবন্দরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বৈধ কাগজপত্র, পর্যাপ্ত ব্যাংক সচ্ছলতার প্রমাণ এবং ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার পরও অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কখনো বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এতে টিকিট, হোটেল বুকিং ও ভিসার পেছনে খরচ করা অর্থ হারাতে হচ্ছে অনেক যাত্রীকে।

আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা

চলতি বছরের জুলাইয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মালয়েশিয়াগামী একটি ফ্লাইটের ৬১ জন যাত্রী কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করেও উড়োজাহাজে ওঠেননি। বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সন্দেহ ছিল, ৭৬ জন যাত্রী একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন এবং তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সেখানে কাজ করা।

এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পর্যটক ভিসায় মালয়েশিয়ায় যাওয়া ১২৩ বাংলাদেশিকে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ফেরত আসা যাত্রীদের কয়েকজন জানিয়েছিলেন, পর্যটক ভিসায় মালয়েশিয়া যেতে তাঁরা দালালদের তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

ভিসায় কড়াকড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ যাত্রীরা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দালালদের মাধ্যমে পর্যটক ভিসায় বিদেশে যাওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ আর দেশে ফিরছেন না। বিশেষ করে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণে আগ্রহী বাংলাদেশিদের ওপরও। বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের পর্যটক ও ভিজিট ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

সূত্রের দাবি, মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ ও বৈধ ভ্রমণকারীরাও ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।

থামানো যাচ্ছে না কেন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এয়ারলাইনসের কাউন্টার থেকে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে যোগসাজশ, গোয়েন্দা তৎপরতার তথ্য ফাঁস এবং নিয়মিত সাংকেতিক শব্দ পরিবর্তনের কারণে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরের এয়ারলাইনস কাউন্টার ও ইমিগ্রেশনে সিসিটিভি ও অডিও নজরদারি জোরদার, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে চক্রটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

দিনভর পরিবারের সঙ্গে কেনাকাটা, গভীর রাতে মাকে বার্তা: অতঃপর…

রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক সামরিক পাইলট ও কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রকাশ্যে এসেছে তার নিখোঁজ...

মদনে শিশু ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১১ নভেম্বর

নেত্রকোণার মদনে ১২ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ ও গর্ভবতী করার মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এ মামলায় আগামী ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন...

Related Articles

১৩ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই বাংলাদেশিকে খুঁজছে লন্ডন পুলিশ

যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য...

শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চাকরি যাবে না: শিক্ষামন্ত্রী

শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের চাকরি যাবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং...

মাদারীপুরের ‘টিকটক কলেজে’ ১৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ২ জন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘টিকটক কলেজ’ নামে সমালোচিত মাদারীপুর সদর উপজেলার মাদ্রা উচ্চ বিদ্যালয়...

ভারত থেকে আমদানি করা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ বন্ধ

ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত...

;