সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উসমানপুর গ্রামের শতবর্ষী ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘উসমানপুর গায়েবি মসজিদ’-এর মূল কাঠামো অক্ষত না রেখে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রাচীন মসজিদটির স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২১ মে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ১৫ সদস্যের একটি মসজিদ কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে অনিয়মতান্ত্রিক ও বেআইনি দাবি করে গ্রামপঞ্চায়েতের একাংশ গত ৪ জুন ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত আপত্তি জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকার সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। পরে কমিটির সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় কমিটি গঠনের বিষয়টি তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন ছাড়াই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে গ্রামবাসীর একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে গ্রামপঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ওয়াক্ফ প্রশাসক এবং ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ আসনের সংসদ সদস্যের কাছে পৃথক আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া মসজিদকে কেন্দ্র করে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে গত ২৫ অক্টোবর লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়।
এ পরিস্থিতিতে গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে ‘পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট’-এর চেয়ারম্যান ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি পর্যবেক্ষক দল মসজিদটি পরিদর্শন করে। এ সময় দলটি সুলতানি আমলের বিরল নিদর্শন হিসেবে পরিচিত মসজিদটির মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে প্রাচীন স্থাপনাটির বিকৃতি ঘটিয়ে বা মূল কাঠামো ধ্বংস করে নতুন স্থাপনা নির্মাণ না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাব ও সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ট্রাস্টি ও পরিবেশ সংগঠক আব্দুল করিম কিম, অ্যাডভোকেট গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, ইতিহাস গবেষক আসিফ আজহার এবং অ্যাডভোকেট সৈয়দ মনির হেলালসহ অন্যরা।
মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে গ্রামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মনির হেলাল বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানা যায়, মসজিদটি সুলতানি আমলের শেষদিকে, ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে মসজিদটি তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে মসজিদটির পরিচালনা, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।
মনির হেলালের অভিযোগ, কথিত কমিটির সেক্রেটারি গ্রামপঞ্চায়েতকে অবহিত না করে এবং তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় কমিটির নাম ব্যবহার করে ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় বা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়াই প্রাচীন মসজিদটি চারদিক থেকে ঢেকে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। এমনকি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, এলাকার কয়েকজন সমাজহিতৈষী ব্যক্তি সালিশ ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অতীতে ছিদ্দিকুর রহমান খান সালমান একাধিকবার এ ধরনের উদ্যোগ ও আপসের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ছিদ্দিকুর রহমান খান সালমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মসজিদটির মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
Leave a comment