মোহাম্মদ রাহবার ইসলাম তুর্য্য
ফরেস্ট্রি পড়া তাঁর শৈশবের স্বপ্ন ছিল না। আগ্রহ ছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর গবেষণার সঙ্গে হাতে-কলমে কাজের সুযোগ বদলে দেয় তাঁর ভাবনার জগৎ। বাস্তব পরিবেশগত সমস্যা, নতুন কিছু উদ্ভাবন এবং গবেষণার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আগ্রহ ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় ভিন্ন এক পথে।
সেই পথ ধরেই এবার বাংলাদেশের একটি তরুণ-নেতৃত্বাধীন বন পুনরুদ্ধার গবেষণাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের ১৬ ব্যাচের (২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষ) সাবেক এই শিক্ষার্থী।
বর্তমানে ম্যানগ্রোভ ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের (এমআইএন) টিম লিডার ও মনোনীত দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশ নিচ্ছেন ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম ট্রান্সফরমেটিভ রিসার্চ চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এ। তাঁদের দল ‘ইয়ুথ-লেড রিসার্চ ফর ফরেস্ট রেস্টোরেশন’ বিভাগে ফাইনালিস্ট নির্বাচিত হয়েছে।
আগামী ৮ থেকে ১৬ অক্টোবর ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হবে ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্ট। সেখানে দলের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
তবে এই গল্প শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফাইনালিস্ট হওয়ার নয়। এটি বরং অনিশ্চিত এক শুরু থেকে নিজের আগ্রহের জায়গা খুঁজে পাওয়ার গল্প। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারে, স্থানীয় একটি পরিবেশগত সমস্যাকে কীভাবে বৈশ্বিক আলোচনায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যায়—এটি সেই গল্পও।
‘দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস’-এর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি’র সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণার মঞ্চে উঠে আসার নানা বাঁক, সাফল্য ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন।
ফরেস্ট্রি ছিল না পরিকল্পনায়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় ফরেস্ট্রি তাঁর কাছে কোনো পূর্বপরিকল্পিত ক্যারিয়ার ছিল না। আগ্রহ ছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। মেধাক্রমের ভিত্তিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনে ভর্তি হওয়ার পর নতুন বিষয় ও ক্যারিয়ার নিয়ে তাঁর মধ্যে স্বাভাবিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
লাইফ সায়েন্সের একটি ডিসিপ্লিনে এসে শুরুতে নিজেকেই প্রশ্ন করতেন—কোন পথে এগোচ্ছেন? তাঁর ভাষায়, ফরেস্ট্রি তাঁর ছোটবেলার পরিকল্পিত ক্যারিয়ার ছিল না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার সঙ্গে হাতে-কলমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজের আগ্রহের জায়গাটি পরিষ্কার হতে থাকে।
তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর আগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট চাকরি বা প্রচলিত ক্যারিয়ার পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা চিহ্নিত করা, নতুন কিছু উদ্ভাবন করা এবং গবেষণার মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান খোঁজার মধ্যেই তাঁর আগ্রহ।
ফলে ফরেস্ট্রি তাঁর কাছে ধীরে ধীরে শুধু একটি একাডেমিক বিষয় থাকেনি; বাস্তব পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে কাজ করার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
শ্রেণিকক্ষ থেকে মাঠের সমস্যা
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তাঁর চিন্তার বড় পরিবর্তন আসে থিসিসের সময়। শ্রেণিকক্ষে বৈজ্ঞানিক বিষয় শেখা আর বাস্তব কোনো সমস্যাকে গবেষণার মাধ্যমে বোঝার মধ্যে যে পার্থক্য, তখনই তা উপলব্ধি করেন তিনি।
কোনো সমস্যা সম্পর্কে শুধু জানা যথেষ্ট নয়—প্রশ্ন করতে হয়, প্রমাণ খুঁজতে হয়, বিভিন্ন অনুমান যাচাই করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য সমাধানের কথা ভাবতে হয়। থিসিসের হাতে-কলমে গবেষণা তাঁকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত করে।
এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আগে তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘কী নিয়ে গবেষণা করব?’ পরে সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি প্রশ্ন—‘এই গবেষণা বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে?’
নিজেকে তিনি এখনো চূড়ান্তভাবে ‘গবেষক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে চান না। বরং নিজেকে একজন আগ্রহী ও নিয়মিত শেখার মানুষ হিসেবে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর কাছে গবেষণা কোনো শেষ হয়ে যাওয়া পরিচয় নয়; বরং প্রতিনিয়ত শেখা ও প্রশ্ন করার একটি প্রক্রিয়া।
যে শিক্ষক বদলে দিলেন দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে গবেষণার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাঁর গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক। তাঁর সঙ্গে হাতে-কলমে কাজ করতে গিয়ে গবেষণাকে নতুনভাবে দেখতে শেখেন তিনি।
একসময় গবেষণা তাঁর কাছে অনেকটা একাডেমিক প্রয়োজনীয়তার মতো মনে হলেও পরে বুঝতে পারেন, গবেষণা শুধু একটি একাডেমিক আউটপুট তৈরি করা নয়। একটি সমস্যাকে নতুনভাবে দেখা, প্রশ্ন করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সমাধানের পথ খোঁজাও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান নয়, গবেষণাকে চিন্তার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখার যে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন, সেটিকেই সবচেয়ে মূল্যবান মনে করেন তিনি।
স্থানীয় সমস্যা থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে
বর্তমানে তাঁর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কোস্টাল শেল্টারবেল্ট ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের পথে থাকা বিভিন্ন সমস্যা। ম্যানগ্রোভ ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের দল এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরির চেষ্টা করছে।
গবেষণার ধারণা ও প্রস্তাবিত সমাধান তৈরির ক্ষেত্রে তিনি প্রধান নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন। গবেষণার ধারণা থেকে শুরু করে প্রস্তাবনা তৈরি এবং সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরার কাজেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
এই গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা চিহ্নিত করার চেষ্টা নয়। ডেটা, প্রযুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে যুক্ত করে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
ফরেস্ট্রি বিষয়ে তাঁর জ্ঞান তাঁকে দিয়েছে পরিবেশগত ও বন পুনরুদ্ধারের দৃষ্টিভঙ্গি। আর গবেষণার হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা সেই জ্ঞানকে একটি কাঠামোবদ্ধ গবেষণা প্রস্তাবে রূপ দিতে সাহায্য করেছে। এই সমন্বয়ই তাঁকে নিয়ে গেছে ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম ট্রান্সফরমেটিভ রিসার্চ চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এর মঞ্চে।
যে প্রতিযোগিতা খুলে দিল বিশ্বমঞ্চের দরজা
ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম ট্রান্সফরমেটিভ রিসার্চ চ্যালেঞ্জ ২০২৬ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের অধীনে পরিচালিত একটি উদ্যোগ।
‘ইয়ুথ-লেড রিসার্চ ফর ফরেস্ট রেস্টোরেশন’ বিভাগে তাঁর দল ফাইনালিস্ট নির্বাচিত হয়েছে। প্রতিযোগিতাটির লক্ষ্য শুধু ভালো গবেষণা-ভাবনা খুঁজে বের করা নয়; প্রাথমিক প্রমাণ-ধারণা থাকা প্রয়োগভিত্তিক গবেষণাকে আরও তথ্যভিত্তিক, পরিশীলিত এবং বাস্তব প্রয়োগ বা পরীক্ষামূলক ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাও এর উদ্দেশ্য।
অর্থাৎ গবেষণা যেন শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে—এই ধারণাই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রাথমিক আবেদন ও প্রমাণ-ধারণার পর বিভিন্ন পর্যায়ে মেন্টরশিপ, মাস্টারক্লাস ও বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়ার সুযোগ হয়। এর মাধ্যমে গবেষণাটিকে আরও পরিশীলিত করা এবং বাস্তব প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।
ফাইনালিস্ট হওয়ার আনন্দ, সঙ্গে দায়িত্ব
ফাইনালিস্ট হওয়ার খবর তাঁর জন্য আনন্দের হলেও এর সঙ্গে এসেছে দায়িত্ববোধ। কারণ তিনি শুধু দলের সদস্য নন, টিম লিডার ও মনোনীত প্রতিনিধি। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁদের গবেষণা তুলে ধরার দায়িত্বও তাঁর কাঁধে।
বাংলাদেশ থেকে তৈরি একটি তরুণ-নেতৃত্বাধীন বন পুনরুদ্ধার গবেষণা এফএও ও ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নেওয়াকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে এটি একই সঙ্গে একটি দায়িত্ব।
নিজের অর্জনের চেয়ে গবেষণাটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে যেতে পারাটাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভালো গবেষণার ধারণা আর কার্যকর সমাধান এক নয়
এই প্রতিযোগিতা থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে তিনি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একটি ভালো গবেষণার ধারণা এবং একটি কার্যকর সমাধান একই বিষয় নয়।
একটি ধারণাকে বাস্তব প্রভাবের দিকে নিতে হলে প্রমাণ, বাস্তবায়নযোগ্যতা, বিস্তারের সম্ভাবনা, অংশীজনের সম্পৃক্ততা এবং বাস্তবায়নের পথ নিয়ে ভাবতে হয়।
অর্থাৎ ‘সমাধানটি কাজ করতে পারে কি না’—এই প্রশ্নের পর আরও বড় প্রশ্ন হলো, ‘যদি এটি কাজ করে, তাহলে বাস্তব দুনিয়ায় কীভাবে এটিকে কার্যকর করা যাবে?’
টিআরসির মেন্টরশিপ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত তাঁকে এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি করতে শিখিয়েছে।
একটি বিস্তৃত পরিবেশগত সমস্যাকে সুস্পষ্ট, বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য গবেষণা-সমাধানে রূপ দেওয়াকেই তিনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন।
রোমে গবেষণা নিয়ে বিশ্বসংলাপে
আগামী ৮ থেকে ১৬ অক্টোবর তাঁর জন্য হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার সময়। ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্টে অংশ নিতে তিনি ইতালির রোমে যাচ্ছেন। সেখানে দলের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেবেন তিনি।
অনুষ্ঠানে নীতি ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা, উদ্ভাবনভিত্তিক কার্যক্রম, কর্মশালা, প্রদর্শনী, পার্শ্ব আয়োজন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকবে।
তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে নিজেদের গবেষণা আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ।
আন্তর্জাতিক গবেষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চান তিনি। এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাঁদের গবেষণার উন্নয়নে কাজে লাগবে বলে মনে করেন তিনি।
শিখবেন, তবে অন্ধভাবে অনুসরণ নয়
ইতালিতে গিয়ে বন বা পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কোন বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করবে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থাকে আগে থেকেই আদর্শ হিসেবে দেখছেন না।
বরং তাঁর আগ্রহ বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও নীতি কীভাবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়, তা বোঝার মধ্যে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকে উঠে আসা কোনো গবেষণার সমাধান অন্য দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করে তৈরি করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। তাই অন্য দেশের কোনো সমাধান সরাসরি অনুসরণ করার পরিবর্তে কোন নীতি বা পদ্ধতি বাংলাদেশের পরিবেশগত, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব, তা দেখতে চান।
বাংলাদেশের বন পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জনসংখ্যার চাপ, ভূমি ব্যবহারের প্রতিযোগিতা, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও জলবায়ু ঝুঁকি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ভূমি ব্যবস্থাপনা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, সেখান থেকে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী শিক্ষা খুঁজে নিতে চান তিনি।
অর্থাৎ শেখা হবে, কিন্তু অনুকরণ নয়। জ্ঞান নেওয়া হবে, তবে তা দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে।
বাংলাদেশের সমস্যাকে বৈশ্বিকভাবে দেখা
রোমযাত্রার সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হিসেবে তিনি দেখছেন বিভিন্ন দেশের গবেষক, নীতিনির্ধারক, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও তরুণ উদ্ভাবকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগকে।
নিজেদের গবেষণা উপস্থাপন করাই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি শুনে বাংলাদেশের সমস্যাগুলোকে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখার সুযোগ তৈরি করাও তাঁর লক্ষ্য।
টিআরসির মেন্টরশিপ পর্যায়েও তিনি উপলব্ধি করেছেন, একই পুনরুদ্ধার-সংক্রান্ত সমস্যাকে একজন গবেষক, মাঠপর্যায়ের কর্মী কিংবা নীতিবিশেষজ্ঞ ভিন্নভাবে দেখতে পারেন।
এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিগুলো গবেষণার উন্নয়নে যুক্ত করাই তাঁর দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোমের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম সেই বিনিময়ের সুযোগ আরও বাড়াবে বলে আশা তাঁর।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখান থেকে যাত্রার শুরু
আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতির মাঝেও নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভুলছেন না তিনি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কাছে বিশেষ। কারণ, তাঁর ভাষায়, এই যাত্রার ভিত্তি তৈরি হয়েছে সেখানেই।
রোমে তিনি শুধু নিজের হয়ে যাচ্ছেন না; দলের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাঁদের গবেষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে যাচ্ছেন। তাই এই সুযোগকে নিজের ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের তরুণ গবেষকদের প্রতিনিধিত্ব হিসেবেও দেখেন তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত বাস্তবতার কথা বলেন।
খুলনা ও বৃহত্তর উপকূলীয় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বাস্তব সমস্যার খুব কাছাকাছি। তাঁর মতে, স্থানীয় বাস্তবতাই হতে পারে গবেষণার বড় সুবিধা। প্রয়োজন শুধু সেই সমস্যাগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন করা এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরা।
শিক্ষার্থীদের জন্য চার পরামর্শ
আন্তর্জাতিক সুযোগের জন্য বর্তমান শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবেন—এ প্রশ্নে তিনি চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রথমত, গবেষণার দক্ষতা—সমস্যা চিহ্নিত করা, গবেষণাপদ্ধতি, তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক লেখালেখি।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ দক্ষতা—বিশেষ করে ইংরেজিতে উপস্থাপন ও গবেষণা প্রস্তাব লেখার সক্ষমতা।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতা—জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণের মতো দক্ষতা।
চতুর্থত, সুযোগ খোঁজার মানসিকতা। তাঁর মতে, একজন শিক্ষার্থী সব সময় আগে থেকে জানতে পারবেন না তাঁর একটি ধারণা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে। তাই স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করা, প্রশ্ন করতে শেখা, সমস্যার সমাধান খোঁজা এবং আন্তর্জাতিক সুযোগের জন্য সক্রিয়ভাবে আবেদন করা জরুরি।
শুধু একাডেমিক ফল নয়, গবেষণাপদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক লেখালেখি, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ, দলগত কাজ ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার সমন্বয় একজন তরুণ গবেষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যে সময় মনে হয়েছিল পথটা ভুল
সাফল্যের গল্পে শেষের আলো দেখা যায়; কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে যে অনিশ্চয়তা থাকে, তা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
তাঁর ক্ষেত্রেও ছিল এমন সময়।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা থেকে ফরেস্ট্রিতে এসে তৈরি হয়েছিল ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা। গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি আগ্রহ থাকলেও প্রচলিত ক্যারিয়ার পথের মধ্যে নিজের জায়গা সব সময় খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত—‘আমি কি সঠিক পথে আছি?’
গবেষণার সঙ্গে হাতে-কলমে যুক্ত হওয়ার পর সেই প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর আগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট চাকরির পদে নয়; সমস্যা চিহ্নিত করা, নতুন কিছু ভাবা এবং গবেষণার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার মধ্যে।
সেখান থেকেই তাঁর পথচলার দিক স্পষ্ট হতে শুরু করে।
পরিবার ও শিক্ষকদের সমর্থন
এই যাত্রায় পরিবার ও শিক্ষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। প্রচলিত বিসিএস বা ব্যাংকের চাকরির বাইরে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে এগিয়ে যেতে চাওয়ার সময় পরিবার তাঁর পাশে ছিল।
আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক তাঁকে গবেষণার কারিগরি দিকের পাশাপাশি গবেষণাকে একটি চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে দেখতে সাহায্য করেছেন।
একজন শিক্ষার্থী নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে সব সময় নিশ্চিত থাকেন না। তবে সঠিক সময়ে একজন শিক্ষক যদি তাঁকে প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিজের চিন্তাকে আরও গভীরভাবে দেখতে শেখান, সেই শিক্ষাই পরবর্তী পথচলার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সামনে আরও বড় পথ
ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম ট্রান্সফরমেটিভ রিসার্চ চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এর ফাইনালিস্ট হওয়াকে নিজের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক হিসেবে দেখছেন তিনি। তবে এটিকে গন্তব্য মনে করছেন না।
বরং তাঁর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গবেষণাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।
এখন গবেষণাকে শুধু একাডেমিক ফলাফল হিসেবে দেখেন না তিনি। ভাবেন—গবেষণা কী প্রমাণ তৈরি করবে, কারা সেই প্রমাণ ব্যবহার করবে এবং কীভাবে একটি সমাধান বাস্তবে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ ও পরে বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব।
রোম থেকে পাওয়া আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের গবেষণা সহযোগিতা ও পেশাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে তাঁর লক্ষ্য শুধু নিজের ক্যারিয়ার নয়; রোম থেকে পাওয়া শিক্ষা তাঁদের গবেষণার ভবিষ্যৎ উন্নয়নে কাজে লাগানো।
রোম থেকে কী নিয়ে ফিরতে চান—এ প্রশ্নের উত্তরে তাঁর প্রত্যাশা, শুধু একটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নয়; আরও বিস্তৃত গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফিরতে চান তিনি।
বিভিন্ন দেশের গবেষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কীভাবে বন পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন, বিজ্ঞান কীভাবে নীতি ও বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং এসব অভিজ্ঞতার কোন শিক্ষা বাংলাদেশের বাস্তবতায় কাজে লাগানো সম্ভব—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে চান।
দলের প্রতিনিধি হিসেবে সেই শিক্ষাগুলো নিজেদের গবেষণার উন্নয়নে কাজে লাগানোও তাঁর দায়িত্ব।
শেষ পর্যন্ত তিনি চান, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, একই সঙ্গে বাস্তবতার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত একজন গবেষক হিসেবে গড়ে তুলুক।
আর সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা—বাংলাদেশের স্থানীয় বন পুনরুদ্ধারের সমস্যা নিয়ে তাঁদের গবেষণা যেন কেবল একটি প্রকল্প হয়ে না থাকে। ভবিষ্যতে এটি যেন বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একসময় যে শিক্ষার্থী জানতেন না ফরেস্ট্রি তাঁর ভবিষ্যৎ কি না, আজ সেই তিনিই বাংলাদেশের একটি স্থানীয় পরিবেশগত সমস্যাকে আন্তর্জাতিক গবেষণার মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার পথে।
গন্তব্য এখনো শেষ হয়নি। বরং রোমযাত্রা তাঁর কাছে শেষ নয়, পরবর্তী ধাপে যাওয়ার একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম।
আর সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে তাঁর মূল প্রশ্ন একটাই—একটি গবেষণা শুধু কোনো সমস্যাকে বুঝবে না, বরং সেই সমস্যার বাস্তব সমাধানে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই উত্তরও খুঁজবে।
Leave a comment