Home জাতীয় অপরাধ রাত ২টা ৪০ মিনিটে বোনের নম্বারে ফোন করল কে?
অপরাধ

রাত ২টা ৪০ মিনিটে বোনের নম্বারে ফোন করল কে?

Share
Share

 

রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া/কামালকাছনা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডে পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

গত ২০ আগস্ট দিবাগত রাতে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। ২২ আগস্ট রাতে স্বজনদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে পুলিশ ওই বাড়ি থেকে পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ ও ঘটনাক্রম সম্পর্কে প্রাথমিক ব্যাখ্যা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান পর্যবেক্ষণে এসব প্রশ্নের কথা বলা হয়। ২৪ ও ২৫ আগস্ট আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রংপুরে গিয়ে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করে। তারা নিহত ব্যক্তিদের স্বজন, প্রতিবেশী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশ, থানা কর্তৃপক্ষ, মর্গ ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি বলে জানায় আসক।

রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকল নিয়ে প্রশ্ন

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী আসককে জানান, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর সঙ্গে বোনের শেষ কথা হয়। তবে পরদিন তিনি দেখতে পান, রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাঁর বোনের মুঠোফোন নম্বর থেকে তাঁকে একটি ফোন করা হয়েছিল। তিনি ফোনটি ধরতে পারেননি।

পূজার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বোন সাধারণত এত রাতে তাঁকে ফোন করতেন না। তাই ওই ফোনকলটি তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

আসক বলছে, পুলিশের বর্ণিত হত্যাকাণ্ডের সময়ের সঙ্গে রাত ২টা ৪০ মিনিটের ওই ফোনকলের বিষয়টি মিলিয়ে দেখা জরুরি। কলটি কে করেছিলেন, কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, ওই সময় মুঠোফোনটি কোথায় ছিল এবং পরে পরিবারের সদস্যদের ফোনগুলো কখন বন্ধ হয়—এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইল ফোনের লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

পুলিশের ভাষ্য

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ আসকের প্রতিনিধিদের জানান, গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নিহতদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন। গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি দেখে ফেললে তাঁদের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা পরিবারের চার সদস্যকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পুলিশের ধারণা।

পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডাকাতির ঘটনা বলে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কিছু সময় বাড়িতেই অবস্থান করেন, খাবার খান এবং পরে পরিস্থিতি অনুকূল হলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তের সূত্র ও আলামতের ভিত্তিতে তাঁদের শনাক্ত করা হয় এবং পরে আদালতে তাঁরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে পুলিশের এই বক্তব্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্বাধীন ও বস্তুগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছে আসক।

ফরেনসিক আলামত যাচাইয়ের তাগিদ

আসকের পর্যবেক্ষণে, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যদি ওই বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন, খাবার খেয়ে থাকেন বা গোসল করে থাকেন, তাহলে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ফরেনসিক আলামত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।

ঘরের বিভিন্ন স্থান, বাথরুম, পানির উৎস, খাবারের পাত্র, দরজা-জানালা, আসবাব ও অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুলসহ সম্ভাব্য জৈব ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের সঙ্গে ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও তদন্তে দেখা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা নিয়ে প্রশ্ন

আসকের প্রতিনিধি দল রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে। তিনি জানান, ঘটনার বিভিন্ন দিক ও আলামত যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাইরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের ব্যাখ্যায়, বাড়ির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সম্ভাব্য সিসিটিভি ক্যামেরায় উপস্থিতি ধরা পড়ার আশঙ্কার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কখন, কীভাবে এবং কে বা কারা বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে আসক। এর সঙ্গে সিসিটিভি বা হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও প্রযুক্তিগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করার কথা বলেছে সংস্থাটি।

অভিযুক্তদের পরিবারের বক্তব্য

সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস তাঁর ছেলের গ্রেপ্তার ও ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশে নেওয়ার সময় তাঁর ছেলের পোশাকসহ কয়েকটি বিষয় নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।

গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাসও তাঁর ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে আসককে জানান। তিনিও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন।

সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক তরুণ সীমান্ত চন্দ্র দাসের বাবা-মায়ের সঙ্গেও কথা বলে আসকের প্রতিনিধি দল। তাঁদের ভাষ্য, ঘটনার রাতে সীমান্ত বাড়িতেই ছিলেন। ওই রাতে সিদ্ধার্থ দাস কিছু সময়ের জন্য তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন, তবে সেখানে রাতযাপন করেননি।

আসক বলছে, এসব বক্তব্যও অন্যান্য তথ্য ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ

আসকের প্রতিনিধি দল মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলে। যতন কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহগুলো পচনশীল অবস্থায় ছিল। তিনি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখেননি। তবে শরীরের কিছু অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে।

নিহত দুই নারীর শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত তাঁর চোখে পড়েনি বলেও তিনি জানান। তবে এ বিষয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আসক বলছে, মর্গের কর্মীর পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, যৌন সহিংসতার কোনো আলামত ছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই বেশি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

আসকের মতে, চারজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনাক্রম নিশ্চিত করতে পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি ডিজিটাল, ফরেনসিক ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক আলামত স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

গোদাগাড়ীতে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

মো. গোলাম কিবরিয়া রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সাথী (১৯) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার ১...

ভরা মৌসুমেও চড়া দামে ইলিশ, কমেছে সরবরাহ

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস শেষ হতে চললেও বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার আকারও আগের তুলনায় ছোট। ফলে...

Related Articles

নোবিপ্রবিতে ১১ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি

  নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৬...

৬ মামলার পর ফের ৫০ পিস ইয়াবাসহ ডিবির খাঁচায় মোস্তাক

মুন্সীগঞ্জে ৫০টি ইয়াবা বড়িসহ মোস্তাক আহম্মদ মহসিন (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার...

মুরাদনগরে দুই ছিনতাইকারী ও ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার

মো. ইয়াছিন সরকার, কুমিল্লা কুমিল্লার মুরাদনগরে পৃথক অভিযানে দুই ছিনতাইকারী ও এক...

রংপুরে ৪ হত্যা : ২ আসামির জবানবন্দি, সামনে এলো নতুন তথ্য

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের...