সিলেটের বিয়ানীবাজারে নিজের কিশোরী মেয়ে রায়কা আক্তার রিয়াকে (১৭) নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার দায়ে ঘাতক পিতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নিহত রিয়া স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে নিজের স্বামী আবু বক্করকে (৪৫) প্রধান আসামি করে বিয়ানীবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। শনিবার (১১ জুলাই) রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে আদালতে হাজির করা হলে নিজের জন্মদাতা সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছে ঘাতক পিতা। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালত ও পুলিশ সূত্র জানায়, ঘাতক আবু বক্কর সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রায়গড় গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন সিএনজি অটোরিকশা চালক। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে নিজের মেয়েকে হত্যার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও এর নেপথ্যের কারণ তুলে ধরে। সে জানায়, মেয়েকে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থেকে সরে আসার জন্য একাধিকবার কঠোরভাবে নিষেধ করা সত্ত্বেও রিয়া তা অমান্য করে। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে সে মেয়েকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে শুক্রবার (১০ জুলাই) জুম্মার নামাজের সময় সুযোগ বুঝে উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের ইনাম গ্রামে মেয়ের নানাবাড়ির পুকুরঘাটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায়।
ঘটনার গভীরে গিয়ে জানা যায়, নিহত রিয়ার সঙ্গে গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বর এলাকার শাহিন নামের এক যুবকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রায় এক বছর আগে তারা বাড়ি থেকে পালিয়েও যায়, তবে মাসখানেক পর পরিবারের সদস্যরা রিয়াকে ফিরিয়ে আনেন। ছেলেটি বখাটে এবং মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তখন বিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর মেয়েকে নিয়ন্ত্রণ ও চোখে চোখে রাখতে বিগত ৩-৪ মাস ধরে ইনাম গ্রামে তার নানাবাড়িতে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে অবস্থানকালেও এলাকার অন্য এক ছেলের মাধ্যমে রিয়া পুনরায় তার পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল।
সম্প্রতি রিয়া আবারও ওই প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিবারের লোকজন তাকে আটকে দেয়। এই খবর জানতে পেরে বাবা আবু বক্কর তীব্র ক্ষোভে বৃহস্পতিবার মেয়েকে নানাবাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। তবে সেই রাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু মেয়ের প্রতি বাবার অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক মনোভাব বুঝতে পেরে পরের দিন শুক্রবার সকালেই রিয়ার নানী ও মামা তাকে পুনরায় নানাবাড়িতে নিয়ে আসেন। তখন আবু বক্কর বাড়িতে ছিলেন না। এরপর দুপুরের দিকে জুম্মার নামাজের সময় ফাঁকা বাড়িতে ঢুকে সে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুজাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের মা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে পুলিশ রাতেই অভিযান চালিয়ে ঘাতক পিতাকে গ্রেফতার করে। রোববার দুপুরে আদালতে সোপর্দ করা হলে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। মূলত প্রেমঘটিত বিষয়ে পারিবারিক কলহ ও ক্ষোভের জের ধরেই এই করুণ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশ তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে।
Leave a comment