ভারতের উত্তরপ্রদেশের ফিরোজাবাদ জেলায় বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মায়ের ওপর ক্ষোভ থেকে মাত্র দেড় বছরের এক অবুঝ শিশুকে রাস্তার শক্ত পিচের ওপর বারবার আছাড় মেরে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের বিরুদ্ধে। নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই শিশুটির নাম আরভ। এই পৈশাচিক ঘটনার পর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের এনকাউন্টারে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গ্রেফতার হয়েছে অভিযুক্ত জিতেন্দ্র পাঠক ওরফে বিরাজ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত শিশু আরভের মা রতি দেবী পারিবারিক বিবাদের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর স্বামী সুমিতের থেকে আলাদা থাকছিলেন। পেশায় মুদি দোকানদার অভিযুক্ত জিতেন্দ্র পাঠক সম্পর্কে রতির স্বামীর আত্মীয়। রতি দেবী যখন তাঁর স্বামীর কাছ থেকে আইনগতভাবে আলাদা হওয়ার (ডিভোর্স) প্রক্রিয়া শুরু করেন, তখন জিতেন্দ্র আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়ে সুকৌশলে রতির কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে। এই আইনি প্রক্রিয়ার খোঁজখবর নেওয়ার উসিলায় একপর্যায়ে সে রতি দেবীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে এবং বারবার বিয়ের প্রস্তাব দিতে থাকে। কিন্তু রতি দেবী প্রতিবারই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তার সেই কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
গত ২৯ মে রতি দেবী এবং তাঁর মা পিঙ্কি দেবী আইনি পরামর্শ নেওয়ার জন্য শিকোহাবাদে গিয়েছিলেন। জিতেন্দ্র সেখানেও তাদের পিছু নেয় এবং আবারও রতিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। রতি আবারও তাকে সরাসরি ‘না’ বলে দেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে জিতেন্দ্রর মনে তীব্র ও বিকৃত ক্ষোভের জন্ম হয়। সে ধরে নেয়, রতি ও তার স্বামীর দেড় বছরের সন্তান আরভ-ই তাদের সম্পর্কের মূল বাধা। আরভ না থাকলে রতি হয়তো তাকে মেনে নেবে—এই ভয়ঙ্কর ও বিকৃত মানসিকতা থেকেই সে শিশুটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
গত শনিবার দুপুর আড়াইটা নাগাদ জিতেন্দ্র সুকৌশলে রতি দেবীর বাড়িতে যায় এবং চকলেট কিনে দেওয়ার নাম করে ছোট্ট আরভকে কোলে তুলে বাইরে নিয়ে যায়। এরপর সে শিশুটিকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানকার একটি সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজে যা দেখা গেছে, তা দেখে শিউরে উঠেছেন খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও। ফুটেজে দেখা যায়, ২৪ বছরের ওই যুবক দেড় বছরের অবুঝ শিশুটিকে দুই হাতে তুলে রাস্তার শক্ত পিচের ওপর বারবার সজোরে আছাড় মারছে।
ঘটনার পর রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে ধুলোবালির মধ্যে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় জিতেন্দ্র। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা আরভকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই নৃশংস ঘটনার পর পুলিশ ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS)-এর ১০৩(১) ধারায় একটি সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা দায়ের করে এবং ঘাতক জিতেন্দ্রর খোঁজে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল জিতেন্দ্র। গত রবিবার গোপন সূত্রে পুলিশ খবর পায় যে, অভিযুক্ত মৈনপুরী রোডের কাছাকাছি একটি নির্জন স্থানে লুকিয়ে আছে এবং সেখান থেকে অন্য কোনো রাজ্যে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
খবর পেয়েই পুলিশের একটি বিশেষ দল ওই এলাকাটি চারদিক থেকে ঘেরাও করে। পুলিশ তাকে আত্মসমর্পণ করতে বললে জিতেন্দ্র উল্টো পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। পুলিশের ছোড়া গুলি জিতেন্দ্রর ডান পায়ে লাগে এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। তার কাছ থেকে একটি দেশি পিস্তল ও বেশ কিছু তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।
শহরের পুলিশ সুপার (এসপি) রবি শঙ্কর প্রসাদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমরা এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সব ধরনের ডিজিটাল ও ফরেনসিক তথ্য-প্রমাণ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সংগ্রহ করছি। আদালতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে যাতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে ঘাতক জিতেন্দ্র পাঠককে আইনের সর্বোচ্চ ও কঠোরতম শাস্তি দেওয়া যায়।” আপাতত পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে অভিযুক্ত জিতেন্দ্র।
Leave a comment