গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার, পদত্যাগ ও দেশত্যাগের শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা নিয়ে এবার শিউরে ওঠার মতো এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দেশ ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে শেখ হাসিনা ৩ পৃষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন এবং সেটি তিনি তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে করে নিজের সঙ্গেই নিয়ে গেছেন বলে দাবি করেছেন দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।
শনিবার (৩০ মে) দুপুরে ইউটিউবভিত্তিক সংবাদ প্ল্যাটফর্ম ‘দি পোস্ট’-এ প্রচারিত একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রবীণ ও প্রভাবশালী এই সাংবাদিক বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এই স্পর্শকাতর অধ্যায়ের নেপথ্যর ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী সাক্ষাৎকারে জানান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূলত সাংবিধানিক নিয়ম ও বিধিমালা মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েই দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। তবে তৎকালীন উদ্ভূত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া পরিস্থিতির কারণে তিনি সেই পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতির কাছে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সশরীরে হস্তান্তর করে যেতে পারেননি; বরং তড়িঘড়ি করে গণভবন থেকে বের হওয়ার সময় খসড়া দলিলটি নিজের সঙ্গেই নিয়ে যান।
পদত্যাগপত্রের ভেতরের বিষয়বস্তু ও তা নিয়ে তৈরি হওয়া নাটকীয়তার বিবরণ দিয়ে এই সাংবাদিক বলেন, শেখ হাসিনা দেশের জন্য তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের বিভিন্ন অবদান, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের খতিয়ান এবং তীব্র আন্দোলনের মুখে দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক ৩ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ চিঠি নিজে লিখেছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) একজন স্টাফের সেটি অফিশিয়ালি টাইপ করার কথা ছিল। কিন্তু গণভবনের বাইরে তখন পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছিল এবং চারদিকের নিরাপত্তা ভেঙে পড়ছিল যে, সেই চিঠিটি চূড়ান্তভাবে টাইপ করার মতো পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। ফলে হস্তলিখিত বা খসড়া সেই কাগজটিই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ব্যাগে থেকে যায়।
মতিউর রহমান চৌধুরী সাক্ষাৎকারে ৫ আগস্ট দুপুরের সেই টানটান উত্তেজনার মুহূর্তটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেন। ৪ আগস্ট রাতের পর ৫ আগস্ট দুপুরে চারদিক থেকে লাখ লাখ মানুষ যখন সব ব্যারিকেড ভেঙে গণভবনের একদম কাছাকাছি চলে আসে, তখন শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর ওয়াকিটকি থেকে অনবরত সতর্কবার্তা আসছিল। একপর্যায়ে দায়িত্বরত জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে সাফ জানিয়ে দেন যে, ‘আপনার হাতে আর এক মুহূর্তও সময় নেই, এখনই গণভবন ছাড়তে হবে।’
এমন চরম তাড়াহুড়ো এবং জীবনশঙ্কার মুখে শেখ হাসিনা তাঁর অতি প্রয়োজনীয় ভ্যানিটি ব্যাগটি ভেতরের একটি চেয়ারের ওপরই ফেলে রেখে বাইরে চলে আসেন। পরবর্তীতে একদম শেষ মুহূর্তে যখন তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে ওঠার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠবেন, তখন পাশে থাকা সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমার ব্যাগটা ভেতরে রয়ে গেছে, ওটা একটু নিয়ে আসো।’ এরপর সেই সেনা কর্মকর্তা দ্রুত ভেতরে গিয়ে ব্যাগটি এনে দিলে তিনি গাড়িতে ওঠেন। মতিউর রহমান চৌধুরীর দাবি অনুযায়ী, ঠিক এই ব্যাগের ভেতরেই সংরক্ষিত ছিল বহুল আলোচিত সেই ৩ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্র।
Leave a comment