টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম নুঠুরচর গ্রামে সরকারি রাস্তার ইটের সলিং তুলে নিয়ে নিজ বাড়িতে পাকা বাথরুম ও গোসলখানা নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের নাম আয়েশা বেগম। তিনি মির্জাপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য। সরকারি প্রকল্পের সাইনবোর্ডটি পর্যন্ত অভিযুক্তের বাথরুমের পাশে পড়ে থাকতে দেখায় এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচি (কাবিটা) প্রকল্পের আওতায় পশ্চিম নুঠুরচর গ্রামের জসিম মিয়ার বাড়ি থেকে আজমত হোসেনের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার রাস্তা মাটি ভরাট ও ইটের সলিং করা হয়। এই গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের আনুমানিক প্রায় আড়াই
লাখ টাকা ব্যয় হয়।
সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নবনির্মিত রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অংশ থেকে নির্বিচারে ইট তুলে নেওয়ায় সামান্য বৃষ্টি ও বর্ষার পানিতে মাটি ধসে পড়ছে। ফলে কৃষকদের মাঠ থেকে উৎপাদিত ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও ফসল পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, সড়কের পাশেই অবস্থিত প্যারাজানি বিলে সহস্রাধিক একর জমিতে বোরো ও রোপা ধানের বিশাল আবাদ হয়। এই অঞ্চলে উৎপাদিত ফসল মূল বাজারে আনার জন্য উক্ত সড়কটিই স্থানীয় শত শত কৃষকদের একমাত্র চলাচলের পথ।
গ্রামের স্থানীয় মোড়ল আব্দুল হালিম অভিযোগ করে বলেন, “এই কাবিটা প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন স্বয়ং ইউপি সদস্য আয়েশা বেগম এবং নাটকীয়ভাবে এই কাজের ঠিকাদারি সাব-কন্ট্রাক্ট পান তাঁর স্বামী তোফাজ্জল হোসেন। রাস্তা নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই রাস্তার ইট খুলে ভ্যানে করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে সেই ইট ব্যবহার করেই বাড়িতে বিলাসবহুল পাকা বাথরুম ও টয়লেট নির্মাণ করা হয়।” গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল জলিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি টাকায় জনগণের জন্য রাস্তা বানাইছে, আবার সেই রাস্তার ইট খুলে নিজেদের বাড়িতে গোসলখানা আর পাকা পায়খানা করছে। কিছু বলতে গেলেই মেম্বার ও তাঁর লোককজন ভয়ভীতি দেখায়।” গত রবিবার অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামীণ রাস্তার সেই সরকারি প্রকল্পের মূল সাইনবোর্ডটি নতুন নির্মিত বাথরুমের ঠিক পাশেই অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার তোফাজ্জল হোসেন। তিনি দাবি করেন, “ওই অর্থবছরে আমি ইউনিয়নের চারটি রাস্তার কাজ করেছি। প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ শেষে আমাদের প্রায় সাড়ে তিন হাজার ইট অতিরিক্ত অবশিষ্ট ছিল। সেই নিজস্ব ইট দিয়েই বাড়িতে বাথরুম নির্মাণ করা হয়েছে। প্রশাসন আমাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো ইট ফেরত চায়নি।” অন্যদিকে ইউপি সদস্য আয়েশা বেগমও চুরির বিষয়টি অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেন, “রাতের আঁধারে কিছু দুষ্ট ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ লোক রাস্তার ইট চুরি করে নিয়ে গেছে। রাস্তার ইট দিয়ে বাথরুম বানানোর প্রশ্নই আসে না। রাস্তা পুনঃসংস্কারের জন্য আমরা নতুন প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।”
এ বিষয়ে গোপালপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ইউপি সদস্যকে আগামী তিন দিনের সময় বেঁধে দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজ খরচে নতুন ইট কিনে রাস্তাটি পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ও চলাচলের উপযোগী না করলে, ইউপি সদস্য ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধিতে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a comment