পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাঙ্গড় থানার নারকেলবেড়িয়ার ঘোষপাড়া প্রথাগতভাবে ডেইরি খামার ও দুগ্ধ ব্যবসার জন্য রাজ্যজুড়ে পরিচিত এই হিন্দুপ্রধান জনপদটিতে এখন শুধুই কান্নার রোল। আসন্ন ঈদুল আজহা তথা কুরবানির ঠিক আগমুহূর্তে গরু কেনাবেচার ওপর প্রশাসনের নতুন কঠোর আইনি বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে এখানকার খাটালগুলোর (খামার) অর্থনীতি। কোটি কোটি টাকার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে শত শত হিন্দু খামারি পরিবার এখন আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে গণ-আত্মহত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের এই অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। খামারিদের চিরাচরিত অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, ডেইরি ফার্মে দেড়- দুই বছর দুধ দেওয়ার পর যখন একটি গাভী অনুৎপাদক হয়ে পড়ে, তখন কুরবানির বাজারে মুসলিম ক্রেতাদের কাছে তা বিক্রি করা হতো। এই বিক্রির বড় লভ্যাংশ দিয়েই খামারিরা পূর্ববর্তী দেনা শোধ করতেন এবং নতুন দুগ্ধজাত গাভী কিনে খামার টিকিয়ে রাখতেন। তবে সাম্প্রতিক নতুন সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে—১৪ বছরের বেশি বয়সী গরু ছাড়া বিক্রি বা কুরবানি করা যাবে না এবং তার জন্য স্থানীয় পঞ্চায়েত সভাপতির প্রত্যয়নপত্রের (সার্টিফিকেট) বাধ্যবাধকতা থাকবে। এই আইনি মারপ্যাঁচে রাতারাতি বাজারগুলোতে ক্রেতাদের আগমন বন্ধ হয়ে গেছে, যার সরাসরি শিকার হয়েছেন প্রান্তিক হিন্দু খামারিরা।
বর্তমানে ঘোষপাড়ার প্রতিটি খাটাল অবিক্রিত গরুতে ঠাসা। একেকটি খামারে ৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত গরু রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক লক্ষ থেকে কোটি টাকা। খামারিরা ব্যাংক লোন, বন্ধকী সোনা এবং চড়া সুদে বাজার থেকে ঋণ নিয়ে এই পশুদের লালন-পালন করেছেন। এখন বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাওনাদার ও কিস্তি আদায়কারীদের চাপে ঘরছাড়া হওয়ার উপক্রম খামারিদের। তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা থেকে খাটাল ব্যবসায়ী সুমিত অধিকারী বলেন, “সরকার এভাবে আমাদের না মেরে বিষ তুলে দিক। এই কুরবানির বাজারে গরু বিক্রি করতে না পারলে আমার ঋণ শোধ হবে না, চারদিকের লোক আমাকে ছিঁড়ে খাবে। আমি বাঁচতে পারব না।” খামারের নারীরাও ব্যাংক লোন শোধ করতে না পেরে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে দিনরাত চোখের পানি ফেলছেন। নারী খামারি মামনি ঘোষ জানান, এটি তাদের ৫০-৬০ বছরের ব্যবসা হলেও এমন সংকটে তারা কখনো পড়েননি।
এদিকে আইনের মারপ্যাঁচে ক্ষুব্ধ খামারিদের একাংশ এখন সরাসরি রাজ্য ও কেন্দ্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। গরু বিক্রি না হওয়াকে তারা ‘গরিবের পেটে লাথি মারা’ হিসেবে দেখছেন। খামারি কানাই ঘোষ সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ব্যবসাটাই তো এমন—দুধ শেষ হবে গরু বিক্রি করব, আবার নতুন গরু আনব। বিক্রি না হলে আমাদের ১৫-২০ লাখ টাকা দেনা কোত্থেকে দেব? আমাদের এই হাজার হাজার গরু নিয়ে গিয়ে নবান্ন এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কার্যালয়ে বেঁধে দিয়ে আসতে হবে। দেখি সরকার কী ক্ষতিপূরণ দেয়।”
অন্য খামারিরা দাবি করেন, মুসলিম ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির ব্যবসায় কোনো সমস্যা না হলেও, হঠাৎ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া এই সর্বনাশা আইন চাপিয়ে দেওয়ায় তারা সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে গেছেন। সরকার দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা বা বিশেষ অনুমতি না দিলে রাজ্যজুড়ে তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই খামারিরা।
Leave a comment