দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে অপ্রতিরোধ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা, মাটি ও মানুষ’-এর দুর্গে অবশেষে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের অভেদ্য দুর্গ তছনছ করে দিয়ে বিজেপি ১৬০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে থেকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক সংস্তুতি নাথ এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণকে চিহ্নিত করেছেন।
এতদিন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের কল্যাণে নারী ভোটাররা ছিলেন তৃণমূলের প্রধান শক্তি। তবে এবারের নির্বাচনে বিজেপি নারীদের নিরাপত্তার ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সামনে আনে। বিশেষ করে আর জি কর মেডিকেল কলেজের মর্মান্তিক ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। পানিহাটি আসনে নির্যাতিতার মাকে প্রার্থী করা এবং কেন্দ্রীয় ধাঁচে উন্নত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি মমতার সবচেয়ে অনুগত এই ভোটব্যাংকে নিজেদের দিকে টানতে সফল হয়েছে।
রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোট সাধারণত বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলের ঝুলিতেই যেত। ২০২১ সালে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অধিকাংশ আসনে তৃণমূল জিতলেও ২০২৬ সালে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে মুসলিম ভোটে ব্যাপক বিভাজন দেখা গেছে। প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দলের প্রভাব এবং অনেক এলাকায় কংগ্রেসের পুনরুত্থান তৃণমূলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে
এবারের নির্বাচনে ভিন রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজ গ্রামে ফিরে এসে ভোট দেওয়া একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়ার আশঙ্কায় হাজার হাজার শ্রমিক বাড়িতে ফিরেছিলেন। অন্য রাজ্যের উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা দেখে আসা এই শ্রমিকরা গ্রামীণ এলাকার গতানুগতিক রাজনীতির ধারায় পরিবর্তন আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।
রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায় এবারের নির্বাচনেও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বাস্তবায়ন ও মতুয়া সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো এলাকাগুলোতে গেরুয়া শিবির নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে, যা তৃণমূলের আসন সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ প্রথাগতভাবেই ক্যাডার-ভিত্তিক রাজনীতির রাজ্য। ২০২৬ সালে বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামো অবশেষে তৃণমূলের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। বুথ স্তরের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতো দাপুটে নেতাদের নেতৃত্বে বিজেপি মাঠ পর্যায়ে তৃণমূলের সাংগঠনিক দাপটকে রুখে দিয়ে জয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।
তৃণমূল যখন ১০০টি আসনের গণ্ডি পার হতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন এটি পরিষ্কার যে, এই পাঁচটি মৌলিক কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে। এর মাধ্যমেই রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পথ সুগম হলো।
Leave a comment