এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আসক বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কমবেশি নির্যাতন বা হয়রানি করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপাকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া কয়েকটি হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক যুবককে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়ে মাসের পর মাস কারাগারে বিনা বিচারে কারাবন্দি রয়েছেন। বারবার জামিনের জন্য আবেদন করলেও সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে।
সাংবাদিকদেরই অনেকে বলছেন, সাংবাদিকেরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তাদের লেখালেখি বা বক্তব্যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে তার আইনি প্রতিকার রয়েছে। এমনকি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু ঢালাওভাবে হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে নাম ধরে ধরে আসামি করা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ বিষয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তাহলে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা এবং দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা নোয়াবের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বলেছি। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা হবে বলে আশা রাখছি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন। সেখান থেকেই তিনি লাইভ সম্প্রচার করেন। অন্য টেলিভিশনেও সেই সম্প্রচারের দৃশ্য দেখা গেছে, যার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
কিন্তু একই দিন বিকেলে মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁকেও আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন এসব তথ্য উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর প্রশ্ন, একই ব্যক্তি একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকেন কীভাবে? এখন বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
শাহনাজ শারমীনের ঘটনাটিই একমাত্র ঘটনা নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে করা বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছিল। বিভিন্ন পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ সাংবাদিক এখনো মামলার বোঝা বহন করছেন এবং কারাবন্দীদের অনেকেই জামিন পাচ্ছেন না।
নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৪ মার্চ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও সদস্য।
গত বছরের আগস্টে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে গিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না)। মাস তিনেক পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এসব ঘটনায় অন্যদের মধ্যেও কিছুটা আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই, মামলাগুলোর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের ক্ষেত্রে আদালত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেবেন। এর আগে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের জামিন পাওয়ারও প্রত্যাশা করছেন তারা।
কারাবন্দি সাংবাদিকদের জামিন বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল। প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখছে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে দায় পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করছেন। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।
Leave a comment