এক বছরের কষ্টের ফসল যখন ঘরে তোলার সময়, ঠিক তখনই প্রকৃতির নিষ্ঠুর পরিহাসে সব হারিয়ে নিঃস্ব নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকরা। গত কয়েকদিনের টানা ভারি বর্ষণ, কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে এ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের সোনালি স্বপ্ন—বোরো ধান। চোখের সামনে কষ্টার্জিত ফসল পচে যেতে দেখে হাওরজুড়ে এখন কেবলই কৃষকের বোবাকান্না আর হাহাকার।
উপজেলার মোজাফরপুর ইউনিয়নের জালিয়ার হাওর, কান্দিউড়া ইউনিয়নের গাব্বুয়ার হাওর এবং চিরাং ইউনিয়নের কালিয়ান বিলসহ বিস্তীর্ণ জনপদ এখন পানিতে নিমজ্জিত। কোমরের ওপর সমান পানিতে নেমে অনেক কৃষককে আধপাকা ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে। জালিয়ার হাওরের কৃষক রাসেল মিল্কী আর্তনাদ করে বলেন, “সারাবছরের আহার আজ পানির নিচে। অনেকবার নদী খননের দাবি জানিয়েছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আজ আমরা সর্বস্বান্ত।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাটেশ্বরী নদী ও সংলগ্ন খালগুলো দীর্ঘদিন খনন না করায় উজানের পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে প্রতিবছর এই চরম মূল্য দিতে হচ্ছে প্রান্তিক চাষিদের।
কেন্দুয়া উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের দুর্যোগে প্রায় ৩ হাজার ১০০ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বৃষ্টির পানিতে প্রায় ৪০০ হেক্টর বোরো ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ৫.৭ হেক্টর পাট ক্ষেত, ৫.৫ হেক্টর সবজি এবং আউশ ধানের বীজতলাও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সরকারি হিসেবের চেয়ে বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।
মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, যেসব কৃষক অতি কষ্টে সামান্য কিছু ধান কাটতে পেরেছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা তা শুকাতে পারছেন না। ফলে ঘরে তোলা ধানও নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জেলা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টি আরও কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে, যা কৃষকদের দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উজ্জ্বল সাহা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। তিনি বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান প্রস্তুত করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
তবে সরকারি ত্রাণের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য নদী খনন ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জোর দাবি জানিয়েছেন হাওরপাড়ের ভুক্তভোগী মানুষ।
Leave a comment