মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পারদ এখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তার ওপর আছড়ে পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাহরাইন সরকার ইরানের সাম্প্রতিক ‘শত্রুতামূলক’ কর্মকাণ্ডে সমর্থন ও সংহতি প্রকাশের অভিযোগে ৬৯ জন ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ইরানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্য সমর্থন করেছেন, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি। সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্তের আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাহরাইনের এই পদক্ষেপ মূলত অভ্যন্তরীণ বিরোধ দমন এবং শিয়া প্রধান ইরানের প্রভাব বলয় থেকে নিজেদের রক্ষা করার একটি কৌশল। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে ইরানপন্থি কার্যক্রম নিয়ে শূন্য-সহনশীলতা (Zero-Tolerance) নীতি অবলম্বন করছে।
উল্লেখ্য, কেবল রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা ঝুঁকিই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। জিসিসিভুক্ত (GCC) দেশগুলো— বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইন— কোভিড-১৯ মহামারির পর বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। যদিও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, যা দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহণ করা হয়, সেটি অবরুদ্ধ বা অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লেও যদি সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। এছাড়া সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং পর্যটন ও পরিবহণ খাতের মন্দা এই দেশগুলোর জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যদি এই উত্তেজনা প্রশমিত না হয়, তবে পুরো অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে পড়বে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই দ্বিমুখী সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a comment