২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন এক চরম অস্থির ও বিতর্কিত সময় পার করেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দুই প্রভাবশালী উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ড. আসিফ নজরুলের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও ব্যক্তিগত আক্রোশের বলি হয়েছে দেশের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট। তাদের শাসনামলে বিসিবি নির্বাচনে জালিয়াতি এবং টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জনের মতো ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে ও কলঙ্কিত করেছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ২০২৬ সালের টি-২০ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বমঞ্চে নিরাপত্তা অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশ দলকে অংশ নিতে দেননি তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ৩ জানুয়ারি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন, ভারতের মাটিতে খেলা বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়।
যদিও পরবর্তীতে তিনি তার অবস্থান থেকে ‘৩৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন’ নিয়ে এই দায় ক্রিকেটার ও বোর্ডের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু নথিপত্র ভিন্ন কথা বলছে। ২২ জানুয়ারি একটি পাঁচতারা হোটেলে ক্রিকেটারদের ডেকে নিয়ে ভারতবিরোধী যুক্তি দেখালেও, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ১৩ জানুয়ারিই এক চিঠিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল—ভারত ছাড়া অন্য দেশে খেলা হলেই কেবল সরকারি সহায়তা মিলবে। আইসিসি ও ভারতের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আসিফ নজরুলের গোয়ার্তুমিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি, যা বৈশ্বিক ক্রিকেটে এক নজিরবিহীন বর্জনের ঘটনা।
আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিসিবির স্বায়ত্তশাসন ধূলিসাৎ করে সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছেন। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবরের বিতর্কিত নির্বাচনে তার মদদপুষ্ট কাউন্সিলরদের মাধ্যমে সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সভাপতি হিসেবে বসানো হয়। ওই নির্বাচনে ৭৬টি ক্লাবের মধ্যে ৩৪টিই অংশগ্রহণ করেনি। ৪৩ জন জেলা ও বিভাগীয় কাউন্সিলর আসিফ মাহমুদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরবর্তীতে ফারুক আহমেদকে সরিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসানোর প্রক্রিয়ায় আইসিসির নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের নির্দেশনায় এই অনিয়মের বিষয়ে একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দেশসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করার পেছনেও আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ার অভিযোগে সাকিবকে দেশের মাটিতে খেলতে বাধা দেন তিনি। এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “সাকিবকে বাংলাদেশের জার্সির পরিচয় বহন করতে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।” তার এই অনড় অবস্থানের কারণে বিসিবি সাকিবকে জাতীয় দলের বাইরে রাখতে বাধ্য হয়, যা পেশাদার ক্রিকেটের শিষ্টাচার বহির্ভূত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
দেশের প্রবীণ ক্রিকেট সংগঠক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি এই পরিস্থিতিকে ‘ক্রিকেটের কালো অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “দুই উপদেষ্টার আক্রোশের শিকার হয়ে আমাদের ক্রিকেট থমকে দাঁড়িয়েছে। তারা বিসিবিকে রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত করেছিলেন। বিশেষ করে বিশ্বকাপ না খেলা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য দীর্ঘস্থায়ী কলঙ্ক। এই সব অপকর্মের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি।”
বর্তমানে বিসিবির নতুন তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করলেও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এখনো কমিটির মুখোমুখি হননি।
Leave a comment