বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ডিজিটাল সম্প্রচার প্রকল্পের আওতায় যন্ত্রপাতি পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণের নামে ২১ কর্মকর্তার ইউরোপ সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একাধিক সরকারি আদেশ (জিও) অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তা জার্মানি, বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ড সফর করবেন, যার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৪ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১২ কর্মকর্তার একটি দল জার্মানি ও বেলজিয়ামে ‘ফ্যাক্টরি ট্রেনিং’-এ অংশ নেবেন। একই প্রকল্পের আওতায় ২৫ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত ‘প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন’-এর জন্য আরও আট কর্মকর্তা ইউরোপ সফরে যাবেন। পৃথক জিওতে এ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইয়াসিনের ওই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উদ্বোধন ও পর্যবেক্ষণের জন্য সফরের কথা উল্লেখ থাকলেও সমালোচনার মুখে প্রতিমন্ত্রী সফরে যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।
৩২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনের দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় এসব সফরের আয়োজন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সফরে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় বিটিভির প্রকৌশলী পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত না করে উপসহকারী প্রকৌশলী এবং প্রেষণে থাকা কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশনে যাওয়া আট কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজনই বিটিভির বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রেষণে কর্মরত বলে জানা গেছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তার প্রভাবেই তালিকা পরিবর্তন করে তার ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেকেই এই সফরকে ‘প্লেজার ট্রিপ’ হিসেবে দেখছেন এবং এতে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। যদিও জিওতে সফরের ব্যয়ভার ‘আমন্ত্রণকারী সংস্থা’ বহন করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে এটি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলেই সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন।
বিতর্কিত এই প্রকল্পটি প্রথম গ্রহণ করা হয় ২০১৮ সালে, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৬০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩২৯ কোটিতে দাঁড়ায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে প্রকল্পটি ইতোমধ্যে সমালোচনার মুখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের আমলেই এ প্রকল্পে অনিয়মের সূচনা হয় এবং যন্ত্রপাতি ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে তার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও ওঠে। পরবর্তীতে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ সফরে সরকারের সরাসরি কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই এবং কর্মকর্তারা এতে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক হামিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সফরের যৌক্তিকতা এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় আরও ঘনীভূত হয়েছে।
Leave a comment