Home উপ-সম্পাদকীয় পররাষ্ট্রনীতির নামে আত্মসম্মানের অবমূল্যায়ন?
উপ-সম্পাদকীয়

পররাষ্ট্রনীতির নামে আত্মসম্মানের অবমূল্যায়ন?

Share
Share

কবি আবিদ কাওসার | ওয়াশিংটনে সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় চাওয়ার খবর নিছক একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ও আত্মমর্যাদার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কেন অন্য একটি দেশের কাছে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য অনুমতি চাইবে? এই প্রশ্নটি আজ জনমনে শুধু অস্বস্তি নয়, ক্ষোভেরও জন্ম দিচ্ছে। কারণ এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মেরুদণ্ড কতটা দৃঢ়—তার একটি নির্মম পরীক্ষা।

সরকারের পক্ষ থেকে হয়তো যুক্তি দেওয়া হবে—বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা কঠিন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আপস করতেই হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আপসের সীমা কোথায়? অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যদি একটি রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, তবে সেই স্বাধীনতার মূল্য কোথায় দাঁড়ায়?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে—এটি সত্য। অনেক দেশই নিজেদের স্বার্থে বিকল্প পথ খুঁজেছে—এটিও সত্য। কিন্তু তারা কি নিজেদের নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দিয়ে অন্যের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে? নাকি তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে?

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতিতে চলেছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই নীতির প্রতিফলন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বরং একটি স্পষ্ট ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে—বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার পরিবর্তে এক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে জনগণের কাছে যথেষ্ট স্বচ্ছতা ছাড়াই। কেন এই ছাড় চাওয়া হলো? বিকল্প কী ছিল? এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য কত? এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট জবাব নেই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই নীরবতা অগ্রহণযোগ্য।

সরকারের দায়িত্ব শুধু অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা নয়; সেই সঙ্গে জাতির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। কিন্তু বর্তমান পদক্ষেপে মনে হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার আদর্শে। সেই ইতিহাস আমাদের শেখায়—কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও মাথা নত করা নয়, বরং দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই একটি স্বাধীন জাতির পরিচয়।

আজকের এই ঘটনাটি কেবল একটি কূটনৈতিক অনুরোধ নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই সরকার তার নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার না করে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—বাংলাদেশ কি সত্যিই নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিচ্ছে, নাকি পরোক্ষভাবে অন্যের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে?

রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নীতিগত দৃঢ়তা। আর সেই দৃঢ়তাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

৪২ বছরের শিক্ষকতা শেষে অবসরে সেগুপ্তা কানিজ আক্তার

সুদীর্ঘ ৪২ বছরের গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি টানলেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাকুমার পাঠশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেগুপ্তা কানিজ আক্তার। মঙ্গলবার ছিল তাঁর...

সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ ডাকাত জোনাব বাহিনীর হাতে জিম্মি জেলেকে উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড

সুন্দরবনের খড়কুড়িয়া খালে অভিযান চালিয়ে দুর্ধর্ষ জলদস্যু জোনাব বাহিনীর হাতে জিম্মি এক জেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড। সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে...

Related Articles

রক্তঝরা ভোর থেকে রাষ্ট্রচেতনার নির্মাণ

কবি আবিদ কাওসার | স্বাধীনতা—শব্দটি উচ্চারণে যত সহজ, তার বাস্তবতা ততটাই কঠিন,...

শক্তির ছায়ায় গণতন্ত্রের ভাষা: বিশ্বরাজনীতির অদৃশ্য দাবার ছক

কবি আবিদ কাওসার | বিশ্বরাজনীতি কখনোই নিষ্পাপ আদর্শের গল্প ছিল না। সভ্যতার...

‘জয় বাংলা’ থেকে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’: রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে রাজনীতির প্রতিচ্ছবি

কবি আবিদ কাওসার | রাষ্ট্রপতি—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদ কোনো দল...

৭ মার্চের আহ্বান: জাতির আত্মপরিচয়ের নির্মাণ

কবি আবিদ কাওসার | ইতিহাসে কিছু ভাষণ আছে, যেগুলো কেবল বক্তৃতা হিসেবে...