দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। হাম-রুবেলা, পোলিও এবং যক্ষ্মাসহ মোট ৬ ধরনের অত্যাবশ্যকীয় টিকার সরকারি মজুত বর্তমানে শূন্যের কোঠায়। এর ফলে সারাদেশে নিয়মিত টিকাদান সেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েক লাখ শিশু ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ (ওপি) বাতিল করা হলে এই সংকটের সূত্রপাত হয়। এর আগে অধিকাংশ টিকা সরাসরি ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনা হতো। তবে নতুন সিদ্ধান্তে বলা হয়, মোট চাহিদার অর্ধেক ইউনিসেফ থেকে এবং বাকি অর্ধেক উন্মুক্ত দরপত্রের (Open Tender) মাধ্যমে কেনা হবে। এই ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন এবং টেন্ডার সংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে টিকার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এই সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া চালু করার ফলে একটি রাষ্ট্রীয় জটিলতা তৈরি হয়েছে। পূর্বের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলেও কোনো বিকল্প ব্যবস্থা হাতে রাখা হয়নি, যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে।”
টিকা কেনার জন্য বিশেষ বরাদ্দের আওতায় ১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের টিকার জন্যই রাখা হয়েছে ৮৪২ কোটি টাকা। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে টিকাগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পুনরায় সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা কেনার পরিকল্পনা করছে, যাতে দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ করা যায়।
টিকার এই সংকটের মধ্যেই সারাদেশে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে হামের প্রকোপ। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়ার মতো রোগের টিকা সঠিক সময়ে না পেলে দেশে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বিশেষ করে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করছে যে কিছু টিকা এখনো মাঠ পর্যায়ে রয়েছে, তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে অনেক অভিভাবক শিশুদের টিকা না দিয়েই ফিরে আসছেন। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়া কার্যকর না করলে দেশের টিকাদানের অর্জিত সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে।
Leave a comment