Home আন্তর্জাতিক মধ্যপ্রাচ্য ভেঙে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ইসরায়েলের বিশাল বাজেট পাস
আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্য ভেঙে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ইসরায়েলের বিশাল বাজেট পাস

Share
Share

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যেই এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইসরায়েল। দেশটির পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ সোমবার গভীর রাতে ইতিহাসের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় বাজেট অনুমোদন দিয়েছে। মোট ২৭১ বিলিয়ন ডলারের (৮৫০.৬ বিলিয়ন শেকেল) এই বিশাল বাজেটে সিংহভাগ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের ভাষায়, এই বাজেট কেবল দেশের অর্থনীতি রক্ষার জন্য নয়, বরং ‘মধ্যপ্রাচ্যকে ভেঙে নতুন করে পুনর্গঠন করার’ একটি মহাপরিকল্পনা।

এই বাজেট অনুমোদন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, মঙ্গলবারের মধ্যে বাজেট পাস না হলে সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ডাক দিতে হতো। ১৩ ঘণ্টার দীর্ঘ বিতর্ক এবং বিরোধী দলের তীব্র বাধার মুখে অবশেষে ৬২-৫৫ ভোটে বিলটি পাস হয়।

অধিবেশন চলাকালে পরিবেশ ছিল থমথমে। ইরান থেকে ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কবার্তা হিসেবে জেরুজালেমে সাইরেন বেজে উঠলে সংসদ সদস্যরা মূল কক্ষ ছেড়ে একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ মিলনায়তনে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকেই ভোটাভুটিতে অংশ নেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বাজেট পাসের মাধ্যমে নেতানিয়াহু আপাতত তাঁর ক্ষমতা সুসংহত করতে সক্ষম হলেন।

২০২৬ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত এই বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে রেকর্ড ১৪৩ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার)। এটি গত অর্থবছরের তুলনায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ এই বরাদ্দকে ‘বিজয়ী হওয়ার বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমুখী যুদ্ধের প্রস্তুতির বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে গাজা উপত্যকায় অভিযানের পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল ও আকাশপথে তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছে ইসরায়েল। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি মাথায় রেখে দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

বাজেট অধিবেশনে স্মোট্রিচের ‘মধ্যপ্রাচ্য ভেঙে পুনর্গঠন’ সংক্রান্ত মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। কাতারভিত্তিক দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি মনে করেন, এটি কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি ধাপ।

এলমাসরি আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইসরায়েল সম্ভবত সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত একটি সর্বাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা এবং এই অভ্যন্তরীণ বাজেটের সমন্বয় ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিতে চায়।”

বাজেটটি পাস হলেও এটি ইসরায়েলি সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা এবং ‘ইয়েশ আতিদ’ পার্টির প্রধান ইয়ার লাপিদ এই বাজেটকে ‘রাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সরকার সাধারণ নাগরিকদের পকেট কাটছে এবং রাজনৈতিক মিত্রদের তুষ্ট করছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট আরও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, “এটি ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বেপরোয়া এবং জায়নবাদ-বিরোধী বাজেট। যখন দেশের মানুষের ত্যাগের প্রয়োজন, তখন সরকার কোষাগার লুট করে কট্টরপন্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে।”
বাজেটে দেখা গেছে, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে গিয়ে অন্যান্য বেসামরিক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ গড়ে ৩ শতাংশ হারে কমানো হয়েছে। অথচ নেতানিয়াহুর জোট সরকারের কট্টর রক্ষণশীল শরিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত ৭৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য বাজেটে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বসতি স্থাপন বিরোধী সংস্থা ‘পিস নাউ’ জানিয়েছে, বেসামরিক খাতে ব্যাপক ব্যয় সংকোচন করা হলেও বসতি স্থাপনের তহবিল অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। গত ডিসেম্বরেই সরকার পশ্চিম তীরের উন্নয়নে ৫ বছরে ৮৭৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল, যা এই বাজেটের মাধ্যমে আরও বেগবান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের এই ২০২৬ সালের বাজেট কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং এটি দেশটির ভবিষ্যৎ সামরিক ও রাজনৈতিক অভিসন্ধির একটি ব্লুপ্রিন্ট। একদিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শান্তির দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের এই বিশাল সামরিক প্রস্তুতি ও ‘মানচিত্র পুনর্গঠনের’ ঘোষণা অঞ্চলটিকে এক অনিশ্চিত ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বনেতারা এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, এই বিপুল সমরাস্ত্র ও অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় শেষ পর্যন্ত কী প্রভাব ফেলে। তবে আপাতত, নেতানিয়াহু সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা এবং যুদ্ধের ময়দান—উভয়কেই দীর্ঘায়িত করার পথ প্রশস্ত করল।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

বিশ্বের দ্রুততম সাবমেরিন ‘সুপার সাব’ দাম ৫৭ লাখ ডলার

নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানি ‘সুপার সাব’ নামে বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম সাবমেরিন তৈরি করেছে, যার মূল্য ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিলাসিতার...

ইরানের হামলায় সৌদি আরবের বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান ধ্বংস

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে বিধ্বস্ত একটি মার্কিন এডব্লিউএসিএস বিমানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে বিবিসি। দুই দিন...

Related Articles

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি সচল করতে ইসলামাবাদে চার দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি গুরুত্বপূর্ণ...

বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী- ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে শেষ জামানায় পদার্পণ করেছে বিশ্ব

ইরানের সাথে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত কোনো সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং এটি...

নিউইয়র্কে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন সিলেটি তরুণী

নিউইয়র্কের কুইন্সে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশি তরুণী নিশাত জান্নাত। রোববার রাতে...

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর সাথে চলমান সম্মুখ যুদ্ধে চার ইসরায়েলি সেনা...