মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন সামরিক শক্তি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। ইরানের মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে নিজেদের সুরক্ষিত ঘাঁটিগুলো ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন মার্কিন সেনারা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হামলার তীব্রতায় কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রাণভয়ে সেনারা নিকটবর্তী সাধারণ হোটেল এবং বাণিজ্যিক অফিস স্পেসগুলোতে অস্থায়ীভাবে অবস্থান নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন।
ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজের ভূ-অবস্থানভিত্তিক (Geolocation) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এ পর্যন্ত অন্তত ১০৪টি মার্কিন ও আঞ্চলিক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। তবে মার্কিন স্যাটেলাইট সংস্থাগুলো ক্ষয়ক্ষতির ছবি প্রকাশে প্রায় ১৪ দিন বিলম্ব করায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র শুরুতে আড়ালে ছিল। ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ জানিয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্তত ১৩টি প্রধান মার্কিন ঘাঁটি এখন বিধ্বস্ত প্রায়।
বিশ্লেষক হিনজের তথ্যমতে, কুয়েতের ‘আলি আল সালেম’ বিমান ঘাঁটিটি সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে, যেখানে অন্তত ২৩ বার আঘাত হেনেছে ইরান। এছাড়া ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প বুহরিংয়ে যথাক্রমে ১৭টি ও ৬টি সফল হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, এসব ঘাঁটির বড় বড় গুদাম, হ্যাঙ্গার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটিতে সেনাদের আবাসন ভবনে বিশাল গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি কাতারের ‘আল উদেদ’-এ একাধিক অ্যান্টেনা ও স্যাটেলাইট অ্যারে ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
ইরানি সূত্রগুলো দাবি করেছে, এই বিশেষ অভিযানে তারা তাদের সবচেয়ে উন্নত ‘খোররামশাহর-৪’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ (THAAD)-এর রাডার ও যন্ত্রাংশ রাখা চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইরান সফলভাবে আঘাত হেনেছে।
‘
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (CSIS)-এর এক জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের এই সুনির্দিষ্ট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ৮০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। জর্ডানে অবস্থিত একটি আমেরিকান থাড রাডার অকেজো হয়ে পড়ার খবরটিও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেনাদের লোকালয় বা সাধারণ হোটেলগুলোতে আশ্রয় নেওয়া ওইসব অঞ্চলের বেসামরিক মানুষের জীবনকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
Leave a comment