Home আন্তর্জাতিক ইরান যুদ্ধের ২৮তম দিন: হামলা, কূটনীতি ও অনিশ্চয়তা
আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের ২৮তম দিন: হামলা, কূটনীতি ও অনিশ্চয়তা

Share
Share

যুদ্ধের ২৮তম দিনে পৌঁছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখনো ভারী ধোঁয়া আর অনিশ্চয়তায়। প্রতিদিনের মতোই বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে শহর, আর সেই সঙ্গে চলছে সমান্তরাল কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ—যেখানে কথার চেয়ে বাস্তবতার চিত্র অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় পরিকল্পিত হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, শান্তি আলোচনা “খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে”। তবে তেহরান থেকে আসা বার্তায় ভিন্ন সুর—ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে “একপেশে ও অন্যায্য” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এই যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। পাকিস্তান নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। একইসঙ্গে তুরস্ক ও মিসরও এই প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে, যেন সংঘাতটি আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়।

তবে মাটির বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে, যেখানে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১,৯০০ ছাড়িয়েছে। পাল্টা জবাবে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে—কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও জর্ডান পর্যন্ত এর প্রভাব পৌঁছেছে।

তেহরানের রাস্তায় মানুষ এখন আর কূটনীতির আশ্বাসে আস্থা রাখছে না। তারা দেখছে চলমান হামলা, শুনছে বিস্ফোরণের শব্দ। অনেকের মতে, এই ধারাবাহিক আক্রমণই প্রমাণ করে যে আলোচনার কথা বলা হলেও বাস্তবে যুদ্ধ থামানোর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চল প্রায় প্রতিদিনই হামলার মুখে পড়ছে। আবুধাবিতে একটি প্রতিহত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুইজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। কুয়েতে নিয়মিত সাইরেন বাজছে, আকাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকছে দিন-রাত।

যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও স্পষ্ট। সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ বাড়ছে, এমনকি ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। একইসঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও জনমত হ্রাস ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ইসরায়েলেও যুদ্ধের চাপ বাড়ছে। দেশটির সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে আরও সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে, যেখানে তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও সমালোচনা বাড়ছে—বিরোধী নেতারা এই বহু-মুখী যুদ্ধকে “নিরাপত্তা বিপর্যয়” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। বৈরুতে বিস্ফোরণ, ইরাকে মার্কিন হামলা এবং তেলের রপ্তানি হ্রাস—সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল একটি জটিল সংকটে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে সংকটে পড়া দেশগুলোকে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বহু অর্থনীতি এর প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে না।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে একটি বিষয় স্পষ্ট—বোমা আর কূটনীতির এই দ্বৈত বাস্তবতায় শান্তির পথ এখনো অনেক দূরের।

 

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব: মধ্যস্থতায় পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাত নিরসনে ইরানকে ১৫ দফার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’...

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘সর্বপ্রথম’ ইরান যুদ্ধের বিষয়ে সমর্থন দিয়েছিলেন: ট্রাম্প

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে চলমান সামরিক অভিযানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের প্রাথমিক ও অনড় অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার...

Related Articles

একাত্তরের গণহত্যার বিচারে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের চালানো গণহত্যার বিচারে বাংলাদেশের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে...

১৬৫ বছরের প্রথা ভেঙে ডলারে বসছে ট্রাম্পের স্বাক্ষর

আমেরিকার ১৬৫ বছরের দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে প্রথমবারের মতো দেশটির কাগজের মুদ্রায় বর্তমান...

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১১০০ ছাড়াল, বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ

লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে। একই...

লেবাননে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হত্যার দাবি ইসরায়েলের

লেবাননে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল।...