রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৭ জন পুরুষ এবং ৮ জন শিশু রয়েছে।
গত বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুনে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা অভিমুখী ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি নদীতে পড়ে দ্রুত তলিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসটিতে ৪০ থেকে ৫৫ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মাত্র ৫ থেকে ৭ জন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও বাকিরা বাসের ভেতরেই আটকা পড়েন। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সহায়তায় বাসটি নদী থেকে ওপরে তোলা হয়।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান রাতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিব মুহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় কমিটিকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের সদস্যরা জানিয়েছেন, নদীতে আর কোনো মরদেহ নিখোঁজ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে তল্লাশি অভিযান এখনো অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই ঘটনা ফেরিঘাটগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং যানবাহন পারাপারের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
দুর্ঘটনায় নিহত যাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন: ১. রেহেনা আক্তার (৬১), স্বামী- মৃত ইসমাঈল হোসেন খান, রাজবাড়ী পৌরসভা। ২. মর্জিনা খাতুন (৫৬), স্বামী- মো. আবু বক্কর সিদ্দিক, কুষ্টিয়া পৌরসভা। ৩. রাজীব বিশ্বাস (২৮), বাবা- হিমাংশু বিশ্বাস, খাগড়বাড়ীয়া, কুষ্টিয়া সদর। ৪. জহুরা অন্তি (২৭), বাবা- মৃত ডা. আবদুল আলীম, রাজবাড়ী পৌরসভা। ৫. কাজী সাইফ (৩০), বাবা- কাজী মুকুল, রাজবাড়ী পৌরসভা। ৬. মর্জিনা আক্তার (৩২), স্বামী- রেজাউল করিম, ছোট ভাকলা, গোয়ালন্দ। ৭. ইস্রাফিল (৩), বাবা- দেলোয়ার হোসেন, খোকসা, কুষ্টিয়া। ৮. সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), বাবা- রেজাউল করিম, ছোট ভাকলা, গোয়ালন্দ। ৯. ফাইজ শাহানূর (১১), বাবা- বিল্লাল হোসেন, কালুখালী, রাজবাড়ী। ১০. তাজবিদ (৭), বাবা- কেবিএম মুসাব্বির, রাজবাড়ী পৌরসভা। ১১. আরমান খান (৩১), বাবা- আরব খান, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ী (বাসচালক)। ১২. নাজমিরা বা জেসমিন (৩০), স্বামী- আব্দুল আজিজ, কালুখালী, রাজবাড়ী। ১৩. লিমা আক্তার (২৬), বাবা- সোবাহান মণ্ডল, রাজবাড়ী সদর। ১৪. জোস্ন্যা (৩৫), স্বামী- মান্নান মণ্ডল, রাজবাড়ী সদর। ১৫. মুক্তা খানম (৩৮), স্বামী- মৃত জাহাঙ্গীর আলম, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ। ১৬. নাছিমা (৪০), স্বামী- মৃত নূর ইসলাম, পার্বতীপুর, দিনাজপুর। ১৭. আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), স্বামী- মো. নুরুজ্জামান, আশুলিয়া, ঢাকা। ১৮. সোহা আক্তার (১১), বাবা- সোহেল মোল্লা, রাজবাড়ী পৌরসভা। ১৯. আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), বাবা- গিয়াসউদ্দিন রিপন, সমসপুর, খোকসা, কুষ্টিয়া। ২০. আরমান (৭ মাস), বাবা- নুরুজ্জামান, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ। ২১. আব্দুর রহমান (৬), বাবা- আব্দুল আজিজ, কালুখালী, রাজবাড়ী। ২২. সাবিত হাসান (৮), বাবা- শরিফুল ইসলাম, রাজবাড়ী সদর। ২৩. আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), বাবা- ইসমাইল হোসেন খান, রাজবাড়ী সদর। ২৪. উজ্জ্বল, বাবা- মজনু শেখ, কালুখালী, রাজবাড়ী। ২৫. আসরাপুল, বাবা- আফসার, কালুখালী, রাজবাড়ী। ২৬. জাহাঙ্গীর, বাবা- সানি উল্লা, কালুখালী, রাজবাড়ী।
Leave a comment