২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে একমাত্র ছেলে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনকে হারানোর এক বছরের মাথায় পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন তাঁর মা–বাবা। শহীদ শাহরিয়ারের বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, সরকারি অনুদানের অর্থের ব্যবহার এবং মাসিক ভাতা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা।
শাহরিয়ারের বাবা শেখ আবদুল মতিন গত ২৯ মে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তিনি দাবি করেন, পরিবারের চাপে এবং বংশধর রাখার প্রয়োজন থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যদিকে, শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করা হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ ছেলের নামে পাওয়া সরকারি অনুদান ও মাসিক ভাতার অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এ অভিযোগে তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বামীর কর্মস্থল আলফা গ্রুপ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপে লিখিত আবেদন করেছেন। একই সঙ্গে ছেলের নামে তাঁর স্বামী যে সরকারি অনুদান ও মাসিক ভাতা পান, তা স্থগিত করারও আবেদন জানিয়েছেন।
মমতাজ বেগম বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জুলাই শহীদ হিসেবে পাওয়া ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের অর্ধেক তিনি এবং অর্ধেক তাঁর স্বামী পেয়েছেন। এ ছাড়া মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ১০ হাজার টাকা করে তাঁরা পৃথক ব্যাংক হিসাবে পান।
তাঁর অভিযোগ, শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া অনুদানের অর্থ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করে তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে স্বামী প্রথম স্ত্রী ও মেয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছেন।
মমতাজ বেগমের ভাষ্য, তাঁদের ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনে ১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে এবং এখনো তাঁদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শেখ আবদুল মতিন। তিনি বলেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এ বিষয়ে তিনি মেসেঞ্জারে স্ত্রীর পাঠানো একটি বার্তার স্ক্রিনশট দেখিয়েছেন।
তবে মমতাজ বেগমের দাবি, সেটি ছিল অভিমান থেকে লেখা একটি বার্তা। তাঁর ভাষায়, ‘অভিমান করে লেখা কোনো কথা দ্বিতীয় বিয়ের আইনি অনুমতি হতে পারে না।’
আবদুল মতিন বলেন, চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর প্রথম স্ত্রীর আর সন্তান ধারণের সক্ষমতা নেই। পরিবারের চাপ, বংশধর রাখার ইচ্ছা এবং সংসার দেখাশোনার প্রয়োজন থেকেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
সরকারি অনুদানের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তাঁর দাবি, স্ত্রী তাঁর প্রাপ্য অর্থ পেয়েছেন এবং সেই অর্থে তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি।
শেখ আবদুল মতিন আরও জানান, স্ত্রীকে বোঝানোর জন্য তিনি কয়েকবার ঢাকার বাসায় গেলেও দেখা করতে পারেননি।
শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর ৮ মাস ১৯ দিন।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী শাহরিয়ার মৃত্যুর পর প্রকাশিত ফলাফলে জিপিএ–৪.৮৩ অর্জন করেন। এর আগে তিনি সিলেটের ব্লুবার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছিলেন।
মমতাজ বেগম বলেন, ছেলে হারানোর পর তাঁর পরিবার গভীর মানসিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মেয়ে একমাত্র ভাইকে হারিয়েছে। এখন বাবাকেও হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
Leave a comment