মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। সংঘাতের তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকায় এখন বড় এক কৌশলগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ।
প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটন কি সামরিক চাপ আরও বাড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, নাকি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ধীরে ধীরে সংঘাত থেকে সরে আসার পথ খুঁজবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় যে ঝুঁকিগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতিতে সেগুলো এখন অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর ফলে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ছে।
যুদ্ধের কৌশলগত হিসাব–নিকাশ:যুদ্ধ চালিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই বাড়ছে সামরিক ব্যয়, ঝুঁকিতে পড়ছে বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জীবন এবং অনিশ্চয়তায় পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া হামলা, সমুদ্রপথে উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রশ্ন – যুদ্ধের রাজনৈতিক দিকটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো বড় যুদ্ধের মধ্যে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে—যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংঘাত আরও বাড়ে এবং প্রাণহানি বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুদ্ধ থামালে লক্ষ্য অপূর্ণ থাকবে?
অন্যদিকে যুদ্ধ থেকে দ্রুত সরে এলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অনেক লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ইরানকে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না দেওয়া।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানে ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সাফল্য সত্ত্বেও ইরান পুরোপুরি সামরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েনি। বরং তারা বিকল্প কৌশল ব্যবহার করে যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
নেতৃত্বে পরিবর্তন, কিন্তু শাসনব্যবস্থা টিকে আছে- এই সংঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। তবে দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে আছে এবং নেতৃত্বে নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটলেও রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সামরিক কাঠামো এখনও সক্রিয় রয়েছে। ফলে যুদ্ধের গতিপথ খুব দ্রুত বদলে যাবে—এমন ধারণা করা কঠিন।
অসম যুদ্ধের আশঙ্কা- বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে দুর্বল হয়ে পড়লেও ইরান অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে মাইন পাতা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে প্রক্সি সংঘাত সৃষ্টি করা।
এসব কৌশল সরাসরি বড় যুদ্ধের তুলনায় কম ব্যয়বহুল হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রতিপক্ষকে বড় ধরনের অস্থিরতার মধ্যে ফেলতে পারে। প্রাণহানি বাড়ছে দ্রুত- সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে।
এর মধ্যে অধিকাংশই ইরানের নাগরিক। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি দাবি করেছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১,৩০০ জন বেসামরিক মানুষ।অন্যদিকে যুদ্ধের সময় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে মার্কিন সেনা উপস্থিতি- পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।এর পাশাপাশি নতুন করে প্রায় ২,৫০০ মেরিন সদস্য পাঠানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের কাছেও হামলা চালিয়েছে বলে সামরিক সূত্রে জানা গেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের হামলা ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশলের অংশ।
হরমুজ প্রণালিতে সংকট- যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়েছে পারস্য উপসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে সাহস পাচ্ছে না।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে।আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা- এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে ওই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যকে নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আহ্বান থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে পুরো পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে না। বরং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তুলেই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন উদ্বেগ-যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইরানের কাছে এখনও প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
এই উপাদান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই ইউরেনিয়াম গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত রয়েছে, যা ধ্বংস বা উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান- মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এসব উপাদান সরিয়ে নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে ইরান আবারও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সেই উপাদান উদ্ধার করতে হলে বিশেষ সামরিক অভিযান চালাতে হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ইরানের সামরিক শক্তি কতটা দুর্বল?
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর বড় অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে স্বাধীন বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি হলেও ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং বিকল্প যুদ্ধকৌশল এখনও সক্রিয়।
ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব-সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে চলমান এই সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কিংবা সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা—দুই পথই বড় ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তায় ভরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু এই যুদ্ধের গতিপথই নির্ধারণ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো এবং বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং কূটনৈতিক মহল ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক কী হতে যাচ্ছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
Leave a comment