Home আন্তর্জাতিক নেতানিয়াহুর ‘দাহিয়া নীতি’ ও ট্রাম্পের যুদ্ধ জয়: ইরান সংকটে দাবার চাল কার?
আন্তর্জাতিক

নেতানিয়াহুর ‘দাহিয়া নীতি’ ও ট্রাম্পের যুদ্ধ জয়: ইরান সংকটে দাবার চাল কার?

Share
Share

 

 

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত এখন এক জটিল মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখানে প্রধান নিয়ন্ত্রক, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি আসলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি অধ্যয়ন বিভাগের এমিরেটাস অধ্যাপক পল রজার্স এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু নিজের তৈরি ফাঁদেই ট্রাম্প এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে টেনে এনেছেন।

রজার্সের মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পরিণতি হলো ‘পূর্ণ বিজয়’। যদি ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তবে তা ইসরায়েলের জন্য চরম পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, টিকে গেলে ইরান তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষা করবে, যা ভবিষ্যতে তাদের ওপর যেকোনো হামলাকে অসম্ভব করে তুলবে।

অধ্যাপক রজার্স উল্লেখ করেন, ইরানকে নিরস্ত্র করতে হলে দেশটির মাটির গভীরের বাংকার এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, যা শুধুমাত্র বিমান হামলা বা বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান দিয়ে সম্ভব নয়।

 

যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের পূর্বাভাস মেনেই এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। মোজতবা খামেনিসহ শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একাধিক বিকল্প নেতা প্রস্তুত রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘প্ল্যান বি’ অনুসরণ করছে। এর দুটি অংশ রয়েছে:
১. কুর্দি বা বালুচদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে বিদ্রোহে উসকানি দেওয়া (যা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ)।
২. দাহিয়া নীতি শত্রুপক্ষের বেসামরিক জনগণের ওপর অবিরাম কঠোর আঘাত হেনে জনসমর্থন ধসিয়ে দেওয়া।

২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধে প্রথম ব্যবহৃত এই নীতি বর্তমানে গাজা ও লেবাননের পর ইরানেও প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাজায় এই নীতি প্রয়োগে ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চললেও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। ইরানের ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের ওপর এই নীতি প্রয়োগ করা একটি বিশাল এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেছেন, এটি হবে “ইরানের ভেতর আমাদের সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন।” তবে ৯ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রজার্স।

এই যুদ্ধের একটি অবশ্যম্ভাবী ফল হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের তেল-গ্যাস স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলা। যদি এমনটি ঘটে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৭৩-৭৪ সালের ওপেক সংকটের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

যদিও ট্রাম্প দাবি করছেন তিনি প্রায় জিতে গেছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে আশার আলো এই যে, ইসরায়েল এবং ওয়াশিংটনের ভেতরে কেউ কেউ এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। এটি একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

চার উড়োজাহাজ, ১৯ ছিনতাইকারী—নিজের পাতা ফাঁদেই কি আটকে গেল যুক্তরাষ্ট্র

সময়টা সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর তখন আর দশটা দিনের মতোই ব্যস্ত। অফিসগামী মানুষের ভিড়, স্কুলে যাওয়ার...

ডিম-মুরগির দাম বাড়তি, মাছেও স্বস্তি নেই রাজধানীর বাজারে

  রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মধ্যে ডিম ও মুরগির দাম এখনো বাড়তি। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ১৫০ টাকায়...

Related Articles

ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় সাফল্যের দাবি

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক সাফল্যের দাবি করেছে দেশটির...

আসলেই কি নির্বাচনে জিতলে ভোটারদের ৫০০০ ডলার করে দেবেন ট্রাম্প?

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশে দেশে...

চার উড়োজাহাজ, ১৯ ছিনতাইকারী—নিজের পাতা ফাঁদেই কি আটকে গেল যুক্তরাষ্ট্র

সময়টা সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর...

গুরুত্বপূর্ণ আরেক প্রণালির দখল নিচ্ছে হুতিরা, তেলের দামে বড় উত্থানের শঙ্কা

  ইরানঘনিষ্ঠ হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলে নিয়েছে। হরমুজ প্রণালির...