পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই স্কুলের ছাত্রী ছিল।
এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য সরাসরি ইরানকেই দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, হামলার ধরন দেখে তাদের ধারণা—এটি ইরানের কাজ হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, “আমাদের মনে হচ্ছে এটা ইরানই করেছে। কারণ তাদের অস্ত্র খুব নিখুঁত নয়। তাদের গোলাবারুদের তেমন নির্ভুলতা নেই।” তার এই মন্তব্য দ্রুতই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ এখন পর্যন্ত কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।মিনাবের ওই স্কুলে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল—কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি এখনও তদন্তাধীন এবং এর প্রকৃত কারণ বা দায়ী পক্ষ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
অন্যদিকে ইরান এই হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছে। তেহরানের দাবি, এই আক্রমণের পেছনে ওয়াশিংটনের হাত রয়েছে এবং এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক উত্তেজনারই একটি অংশ।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, মিনাবের এই হামলা ছিল একটি পরিকল্পিত আঘাত, যার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।
ফরাসি সংবাদসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, তাদের সাংবাদিকরা এখনও মিনাবের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারেননি। ফলে হামলার প্রকৃত পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা নিহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।এই কারণে ঘটনাটিকে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) শুক্রবার দাবি করেছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসির অভিযোগ, ওই ঘাঁটি থেকেই মিনাবের স্কুলে হামলা চালানো হয়েছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলার জবাব দিতেই তারা মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে।
একই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে কখনোই কোনো স্কুল বা বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাবে না। রুবিও বলেন, “আমেরিকা কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।”
মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এই ঘটনার একটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছে নৌবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালাচ্ছিল।
ওই এলাকায় ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডসের একটি নৌঘাঁটিও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই সামরিক অভিযানের সময়ই ভুলবশত বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মিনাবের স্কুলে আঘাত লাগতে পারে।
সংবাদপত্রটির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—স্কুলে আঘাত লাগার সময় কাছাকাছি এলাকায় গার্ডসের নৌঘাঁটিতেও হামলা হচ্ছিল।
তবে এই সম্ভাবনাটি এখনও নিশ্চিত নয় এবং এটি কেবল একটি বিশ্লেষণ হিসেবেই সামনে এসেছে। মিনাবের এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সামরিক তৎপরতা, ড্রোন হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।বিশ্লেষকদের মতে, মিনাবের এই ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
Leave a comment