লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ মেয়াদের বার্ষিক নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। অপরদিকে, আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা আটটি পদে বিজয় অর্জন করেছেন। তবে জামায়াত সমর্থিত কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিনিয়র আইনজীবী এ কে এম হুমায়ুন কবির চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ভোট গণনা শেষে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। তারাবির নামাজের বিরতির কারণে ফল প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
নির্বাচনে মোট ১৫টি পদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ৬টি, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা ৮টি এবং একটি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন মনিরুল ইসলাম হাওলাদার (বিএনপি)। সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল মজিদ চৌধুরী (বিএনপি) ও আবুল খায়ের (আওয়ামী লীগ)। সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয়ী হন মো. রফিক উল্যা (বিএনপি)। সহ-সম্পাদক পদে জয় পান ফখরুল ইসলাম জুয়েল (বিএনপি) ও চাঁদমনি মোহন (আওয়ামী লীগ)।
পাঠাগার সম্পাদক পদে মোশারফ হোসাইন (বিএনপি), সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে জামাল উদ্দিন (আওয়ামী লীগ) এবং অডিট সম্পাদক পদে রাকিবুল হাসান অপু (আওয়ামী লীগ) নির্বাচিত হন।
সদস্য পদে বিজয়ী হয়েছেন আজহার উদ্দিন রকি (আওয়ামী লীগ), নুরুল হুদা মুরাদ (স্বতন্ত্র), ইউসুফ (আওয়ামী লীগ), মো. ইউসুফ মানিক (আওয়ামী লীগ), আবদুল্লাহ আল নোমান (আওয়ামী লীগ) ও জাফর আহমেদ (বিএনপি)।
নির্বাচনের আগে গত ২৬ জানুয়ারি এক নোটিশে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটির সদস্য সচিব নুরুল হুদা পাটওয়ারী জানান, তাদের আহ্বায়ক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬-২৭ মেয়াদের নির্বাচনে কোনো পদে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং আটটি পদে জয়লাভ করেন।
এ বিষয়ে নুরুল হুদা পাটওয়ারীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগ সমর্থিত লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির সাবেক এক সভাপতি বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। দলীয় সিদ্ধান্ত নির্বাচন থেকে বিরত থাকার হলেও, ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই অন্যান্য পদে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরাও অংশ নিলেও কেউই জয়ী হতে পারেননি। স্থানীয় আইনাঙ্গনের পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ফলাফল জেলা পর্যায়ের পেশাজীবী সংগঠনে রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি প্রতিফলন।
নির্বাচন ঘিরে আইনজীবীদের মধ্যে উৎসাহ ছিল লক্ষণীয়। ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচন সাধারণত জেলা আইনাঙ্গনে প্রভাব বিস্তারকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ সমিতির নেতৃত্ব স্থানীয় আইনি কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং পেশাজীবী স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভোটগ্রহণ ও গণনা সম্পন্ন হয়েছে। কোনো বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন স্থানীয় রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও দেখা হয়। জাতীয় রাজনীতির প্রভাব জেলা পর্যায়ের পেশাজীবী সংগঠনগুলোতেও প্রতিফলিত হয়—এ নির্বাচন তারই একটি উদাহরণ।
বিশেষ করে, আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণার পরও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের জয় রাজনৈতিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের দিকটি সামনে এনেছে। অন্যদিকে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপির জয় সংগঠনের নেতৃত্বে তাদের প্রভাব বজায় থাকার ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ মেয়াদের জন্য গঠিত নতুন কমিটির সামনে আইনজীবীদের পেশাগত স্বার্থরক্ষা, আদালত সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সমিতির সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার চ্যালেঞ্জ থাকবে।
Leave a comment