ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ঘোষিত দেশের অন্যতম বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী পুরস্কারের তালিকায় এবার মোট ১৩১ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ ও পদ্মশ্রী—এই তিন ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন ১১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তবে এই রাজ্য থেকে এবার পদ্মবিভূষণ বা পদ্মভূষণ পাচ্ছেন না কেউ।
ভারতের একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি পদ্মশ্রী সম্মানের জন্য মনোনীত হয়েছেন, তারা সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত, চিকিৎসা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য স্বীকৃতি পাচ্ছেন। তবে এই তালিকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির নাম না থাকায় বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে পদ্মশ্রী মনোনীত ১১ জন হলেন—অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শিল্পী তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়, শিল্পী জ্যোতিষ দেবনাথ, সন্তুরবাদক তরুণ ভট্টাচার্য, তবলাবাদক কুমার বোস, চিকিৎসক সরোজ মণ্ডল, সাহিত্যিক অশোক কুমার হালদার, সাহিত্যিক রবিলাল টুডু, নাট্যকার হরিমাধব মুখোপাধ্যায় (মরণোত্তর), শিক্ষাবিদ গম্ভীর সিং ইয়োনজোন এবং সাহিত্যিক মহেন্দ্র নাথ রায়।
এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সক্রিয় এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। বিশেষ করে সংস্কৃতি ও সঙ্গীত অঙ্গনে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী অবদান আবারও স্বীকৃতি পেল বলে মনে করছেন অনেকে। চলচ্চিত্র, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি এবং সাহিত্যের মতো ক্ষেত্রে এ রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য।
তবে সমালোচনার জায়গাটি তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত—প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অথচ এবার পদ্মশ্রী তালিকায় এই সম্প্রদায় থেকে কোনো নাম না থাকায় প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই বিষয়টিকে পরিসংখ্যানগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কেউ এটিকে নিছক কাকতালীয় বলেও উল্লেখ করেছেন।
পদ্ম পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণত বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষ অবদান, দীর্ঘদিনের কাজ, জাতীয় প্রভাব এবং সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়। সরকারি সূত্রে বরাবরই বলা হয়, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তিগত অবদানের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। তবু প্রতি বছরই তালিকা প্রকাশের পর বিভিন্ন রাজ্য, ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা দেখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য পদ্ম সম্মানপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী উস্তাদ রশিদ খান। তিনি ২০২২ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তার অবদান জাতীয়ভাবে স্বীকৃত এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সাংস্কৃতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, পদ্ম পুরস্কারের তালিকা অনেক সময়ই দেশের বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামোর প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। ফলে কোনো বড় সম্প্রদায়ের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা এও মনে করিয়ে দেন যে, প্রতি বছরই তালিকা ভিন্ন হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব বিচার করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অবদান নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে অভিনয়শিল্পী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন। একইভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করা অন্যান্য মনোনীতদের অবদানও আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, এ বছরের পদ্মশ্রী তালিকা পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হলেও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। আগামী বছরগুলোতে এই ভারসাম্য কেমন থাকে, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
Leave a comment