যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বাঙ্কারে লুকিয়ে আছেন—এমন গুঞ্জন নাকচ করেছেন ভারতের মুম্বাইয়ে নিযুক্ত ইরানের কনসাল জেনারেল সাঈদ রেজা মোসায়েব মোতলাঘ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, খামেনির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও তিনি কোনো গোপন আশ্রয়ে নেই এবং নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
মোতলাঘ বলেন, “আয়াতুল্লাহর নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তাকর্মী থাকা স্বাভাবিক বিষয়। তবে তিনি বাঙ্কারে লুকিয়ে আছেন—এমন ধারণা ভুল।” তার দাবি, সর্বোচ্চ নেতা ভিডিও কনফারেন্সিংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন।
সাক্ষাৎকারে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার অভিযোগ, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বিশ্বের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার উসকানি ছিল। তিনি বলেন, একটি সময় পর্যন্ত ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংযম দেখিয়েছে। তবে পরবর্তীতে “সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো” বিদেশে অবস্থানকারী “নিয়ন্ত্রকদের” কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়ে নাশকতায় জড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানি এই কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় ও ছোট শহরের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, যাতে নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়। তিনি দাবি করেন, এসব ঘটনায় মোট ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৪২৭ জন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৬৯০ জন “সন্ত্রাসী” রয়েছেন। তবে এই সংখ্যার স্বাধীন যাচাই সম্পর্কে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
বিক্ষোভে বিদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরাসরি বিদেশি অংশগ্রহণ ছিল না বা খুবই সীমিত ছিল। তবে তার দাবি, বহু বিক্ষোভকারী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব বা প্রশিক্ষণের আওতায় ছিল, অথবা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের সংবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মোতলাঘ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, যার মধ্যে বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের কথাও রয়েছে, ইরানকে ভয় দেখাতে পারবে না। তার ভাষ্য, “ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত” এবং অতীতে যে কোনো আগ্রাসন মোকাবিলার সক্ষমতা তারা দেখিয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা দুই দিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো স্থিতিশীল রয়েছে। তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো শক্তি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিলে দেশটি আত্মরক্ষায় পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করবে।
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, নিষেধাজ্ঞার হুমকি থাকা সত্ত্বেও ইরান ও ভারত পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক কূটনীতি, বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
খামেনিকে ঘিরে নিরাপত্তা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে গুঞ্জন রয়েছে, সেটিকে তিনি “গুজব” বলে আখ্যা দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যকর রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও বিক্ষোভ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা আলাদা পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ তুলে ধরলেও ইরান সরকার সেগুলোর অনেকটাই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে মোতলাঘের মন্তব্য ইরান সরকারের অবস্থানই প্রতিফলিত করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
Leave a comment