Home আন্তর্জাতিক গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত
আন্তর্জাতিক

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত

Share
Share

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ ও নিন্দার সুর জোরালো হয়েছে। বুধবার গাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চালানো এই হামলায় নিহতদের মধ্যে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকও রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর।

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গাজা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত আল-জাহরা এলাকায় একটি বেসামরিক যান লক্ষ্য করে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়। হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে তিনজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করে দেইর আল-বালাহ শহরের আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিহত সাংবাদিকরা হলেন মোহাম্মদ সালাহ কাশতা, আবদুল রউফ শাআত এবং আনাস ঘনেইম। তাদের মধ্যে আবদুল রউফ শাআত দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করা একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ছিলেন এবং ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির সঙ্গে পেশাগতভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হামলার সময় তিনি এএফপির কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিলেন না।

ঘটনার পরপরই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তারা মধ্য গাজা উপত্যকায় হামাস-সংশ্লিষ্ট একটি ড্রোন পরিচালনাকারী কয়েকজন ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ড্রোনটি ইসরায়েলি সেনাদের জন্য তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছিল। সে কারণে নির্ধারিত সামরিক কমান্ড চেইনের অনুমোদন নিয়ে ‘নির্ভুল ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা’ চালানো হয়।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের বিবৃতিতে ড্রোনটির প্রকৃতি, কার্যক্রম কিংবা কীভাবে সেটিকে হামাস-সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। এই অস্পষ্টতাকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও সহকর্মী সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত তিন সাংবাদিক একটি মিসরীয় রিলিফ কমিটির ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন। সেই কাজে একটি ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল, যা পুরোপুরি সাংবাদিকতামূলক ও মানবিক কার্যক্রমের অংশ ছিল। তারা দাবি করেন, ত্রাণ কার্যক্রম নথিবদ্ধ করার সময়ই সাংবাদিকদের বহনকারী যানবাহনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।

এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি ঘটনাটিকে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘প্রকাশ্য ও গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। হামাসের মতে, এটি শুধু সাংবাদিকদের ওপর হামলাই নয়, বরং সংঘাতকে নতুন করে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত।

বিবৃতিতে হামাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এদিকে ফিলিস্তিন জার্নালিস্টস সিন্ডিকেটও হামলার কঠোর সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়, এই হামলা ইসরায়েলি দখলদার শক্তির অনুসৃত একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত নীতির অংশ, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা। তারা দাবি করে, সংঘাত শুরুর পর থেকে গাজায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর ফলে ইসরায়েলি বাহিনী ও হামাসের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ কিছুটা কমে আসে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে একাধিকবার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে।

হামাস-শাসিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৪৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও হাজারো মানুষ। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বেসামরিক নাগরিক ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকদের মৃত্যু শুধু একটি মানবিক ট্র্যাজেডিই নয়, বরং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে—এই ঘটনাই তার সর্বশেষ প্রমাণ।
সূত্র: এএফপি

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ইরানের পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত: নিউইয়র্ক টাইমস

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭টি সামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম...

কাতারে ৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান

ইরান উপসাগরীয় দেশ কাতারে নতুন করে ৯টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং কয়েকটি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে কাতারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি...

Related Articles

নেতানিয়াহুকে ‘খুঁজে বের করে হত্যার’ হুঁশিয়ারি দিল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে...

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে মিসাইল হামলা, মার্কিনীদের তথ্য দিলে লাখ ডলার পুরস্কারের ঘোষণা

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে দূতাবাসের...

নেতানিয়াহু কোথায়? ‘ছয় আঙুল’ বিতর্কে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে...

উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্ত হবে—মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর...