সাভারে একের পর এক ছয়টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। ভবঘুরের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো মশিউর রহমান খান সম্রাট (৪০) নামের এক ব্যক্তি ঠান্ডা মাথায় বৃদ্ধা, নারী ও কিশোরীসহ ছয়জনকে হত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। রোববার (১৮ জানুয়ারি) সাভার পৌর এলাকার একটি পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টার থেকে জোড়া লাশ উদ্ধারের পর তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়।
আগুনে পোড়া ওই দুটি মরদেহের সূত্র ধরে আগের কয়েক মাসের হত্যাকাণ্ডগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতে সক্ষম হন তদন্তকারীরা।,প্রায় সাত মাস আগে সাভার মডেল মসজিদের সামনে প্রথম একটি নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর গত বছরের ২৯ আগস্ট সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার এলাকা থেকে একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থান থেকে গত ১৯ ডিসেম্বর আরও একটি মরদেহ পাওয়া যায়। সর্বশেষ রোববার (১৮ জানুয়ারি) ওই কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে আগুনে পোড়া অবস্থায় দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘন ঘন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে কমিউনিটি সেন্টার ও আশপাশের এলাকা ‘ভয়ংকর জোন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে এতদিন এসব ঘটনাকে আলাদা আলাদা অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
রোববার দুপুরে জোড়া লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ আগের ঘটনাগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ এবং এক সাংবাদিকের ধারণ করা একটি ভিডিও বিশ্লেষণ শুরু করে। ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি কাঁধে করে মরদেহ বহন করছেন। তাকে এলাকায় সবাই একজন নিরীহ ভবঘুরে হিসেবেই চিনত। অথচ সেই পরিচিত মুখটিই যে একাধিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে—তা কারও কল্পনাতেও ছিল না।
ফুটেজ শনাক্তের পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ওই ব্যক্তিকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট বলে জানা যায়। তবে পুলিশ বলছে, এটি তার আসল নাম নয়; নিজেকে আড়াল করতেই তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তার প্রকৃত পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করা হচ্ছে, এবং জানা গেছে তার বাড়ি সাভারে নয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন । তিনি দাবি করেছেন, কোনো পাগল বা ভবঘুরেকে অনৈতিক যৌনাচারে লিপ্ত হতে দেখলেই তিনি তাদের হত্যা করতেন। নিজের ভাষায়, তাদের ‘থার্টি ফোর’ বা ‘সানডে মানডে ক্লোজ’ করে দিতেন—যা তদন্তকারীদের মতে এক ধরনের ভয়ংকর মানসিক বিকৃতির ইঙ্গিত দেয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সম্রাট প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটান ২০২৫ সালের ৪ জুলাই। ওই রাতে সাভার মডেল মসজিদের সামনে আসমা বেগম নামের এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর ২৯ আগস্ট পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে এক যুবককে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলেন তিনি।
একই বছরের ১১ অক্টোবর সেখানে আরও এক নারীকে হত্যা করা হয়। পরে ১৯ ডিসেম্বর আরেক যুবককে হত্যা করেন। সর্বশেষ শনিবার রাতে এক কিশোরীসহ দুজনকে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনায় সাভার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাখাওয়াত ইমতিয়াজ বাদী হয়ে রোববার রাতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মশিউর রহমান খান সম্রাটসহ আরও অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিমান্ডে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পদ্ধতি, সম্ভাব্য সহযোগী এবং তার প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়ার কথা ভাবছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পরপর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দীর্ঘদিন আতঙ্কে থাকা সাভারবাসী পুলিশের অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, অপরাধী শনাক্ত হওয়ায় ভয়ের পরিবেশ কিছুটা কমবে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এমন নৃশংস সিরিয়াল কিলারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে সমাজে ভুল বার্তা যাবে
Leave a comment