ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ নাগরিকসহ প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সংস্থাটির প্রতিবেদনে ইরানি এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, এটি এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সবচেয়ে বড় প্রাণহানির সংখ্যা, যা দেশটির চলমান অস্থিরতার ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ মূলত অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত হলেও দ্রুতই তা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভের বিস্তৃত বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন, লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রথম রাস্তায় নামেন।
প্রথম দিনের এই আন্দোলন দ্রুত রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ ও কেরমানশাহসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দেওয়ায় আন্দোলনের গতি ও ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ।
ইরানি কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে আসছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি শক্তি ও তাদের সহযোগী ‘সন্ত্রাসীরা’ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালিয়ে বিক্ষোভ দমনে নামে।
বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও গণগ্রেপ্তারের পাশাপাশি কোথাও কোথাও গুলিবর্ষণেরও অভিযোগ ওঠে। এসব সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, যদিও সরকারিভাবে এতদিন নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত মোট প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ নাগরিক আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য—সে বিষয়ে আলাদা করে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই মৃত্যুর জন্য মূলত ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী, যদিও এই বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
সরকারি সূত্রের এই বড় সংখ্যার বিপরীতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তুলনামূলক কম হলেও উদ্বেগজনক হিসাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তাদের হিসাবে অন্তত ৬৪৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী এবং নয়জন শিশু রয়েছে।
এইচআরএএনএ আরও জানায়, ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৮৭টি শহরে মোট ৬০৬টি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে এবং এসব ঘটনায় অন্তত ১০ হাজার ৭২১ জনকে আটক করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীও রয়েছেন।
সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানের এই বড় পার্থক্য পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং তথ্যপ্রবাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, বিক্ষোভে ‘শত শত’ মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও তারা নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেন,
“ভয়ঙ্কর সহিংসতার এই চক্র চলতে পারে না। ইরানের জনগণের ন্যায্যতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের দাবি অবশ্যই শোনা উচিত।”
প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক দাবিতে শুরু হলেও বিক্ষোভের চরিত্র দ্রুত বদলে যায়। রিয়ালের পতন ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। নারীদের ওপর বিধিনিষেধ, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করে তোলে। অনেক জায়গায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশও দেখা গেছে, আবার কোথাও তা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
রয়টার্সের প্রকাশিত সংখ্যাটি যদি সঠিক হয়, তবে এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইরানের সবচেয়ে প্রাণঘাতী গণআন্দোলনগুলোর একটি। তবু সরকার এখনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছুক। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক প্রবেশের অনুমতি মেলেনি।
এই অবস্থায় ইরানের ভবিষ্যৎ পথ অনিশ্চিত। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক ক্ষোভ, অন্যদিকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা—এই দ্বন্দ্ব দেশটিকে আরও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতির দিকে নজর রাখলেও বাস্তব সমাধান কীভাবে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
Leave a comment