ইরানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ এখন দেশটির ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে এই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে।
এর মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারী এবং অন্তত চার ডজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন করে ভয়াবহ উত্তেজনার দিকে গড়াচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানানোয় তেহরান কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়েছে।
এইচআরএএনএর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও হাজারো মানুষ। দুই সপ্তাহের টানা অস্থিরতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০ হাজার ৬০০-এর বেশি ব্যক্তি, যাদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করছে।
ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভিডিওতে তেহরানের মর্গগুলোতে সারি সারি লাশের ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ নিহতদের একটি অংশকে ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসী’ ও ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রে জড়িত দুষ্কৃতকারী’ বলে অভিহিত করেছে।
বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠার প্রতিবাদে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তা রূপ নেয় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে, যেখানে রাজনৈতিক সংস্কার, বাকস্বাধীনতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে লাখো মানুষ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, “ইরান স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছে—যা তারা আগে কখনো পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের জন্য প্রস্তুত।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ট্রাম্প তার শীর্ষ নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসবেন। সেখানে ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় চারটি বিকল্প তার সামনে উপস্থাপন করা হতে পারে। এগুলো হলো—সরাসরি সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিক্ষোভকারীদের ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া।
এই সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন ইরান ইতোমধ্যে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিচ্ছে।
মার্কিন হুমকির জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সংসদে বলেন, “ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।”
তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ সংকটকে কাজে লাগিয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা কোনো হঠকারী পদক্ষেপ নেয়, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে পুরোপুরি ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স নিশ্চিত করেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ চলছে।
মাশহাদের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ চলছে এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। রাজধানী তেহরানেও রাতভর বিশাল মিছিলের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে জনসমুদ্রের যেন কোনো শুরু বা শেষ নেই।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা এখনো পরিস্থিতিকে ইরানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবেই দেখছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ চলছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য তারা পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
Leave a comment