ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিতে আবারও নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) সভাপতি ও হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়েইসি। “একদিন হিজাব পরা নারীই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন”—এই বক্তব্য দিয়ে তিনি শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, সামাজিক ও সাংবিধানিক আলোচনাকেও নতুন করে উসকে দিয়েছেন। মহারাষ্ট্রে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া এই মন্তব্য এখন দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা বক্তব্যের জন্ম দিয়েছে।
আগামী ১৫ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পৌরসভা নির্বাচন। তার আগে রবিবার রাজ্যের সোলাপুর জেলার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এক নির্বাচনী সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে ওয়েইসি সরাসরি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিজেপি হিজাবকে যেভাবে রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে, তার জবাব দেবে ভারতের সংবিধান ও জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা।
ওয়েইসি তার বক্তব্যে বলেন, “নির্বাচন এলেই বলা হচ্ছে—এই মেয়ে মেয়র হবে না, ওই মেয়ে মেয়র হবে না। পাকিস্তানের সংবিধানে লেখা আছে, নির্দিষ্ট একটি ধর্মের মানুষই শুধু প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হতে পারে। কিন্তু ভারতে বাবাসাহেব আম্বেদকরের তৈরি সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো নাগরিক—সে হিজাব পরুক বা না পরুক—প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী কিংবা মেয়র হতে পারে।” এরপর তিনি দৃঢ় কণ্ঠে যোগ করেন, “আমার বিশ্বাস, এমন একদিন আসবে, হয়তো আমরা সে দিন দেখব না, কিন্তু হিজাব পরা নারীই একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। ইনশাল্লাহ।”
তার এই বক্তব্য শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, বরং ভারতের সংবিধান যে নাগরিকের ধর্ম, পোশাক বা পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য অনুমোদন করে না—সেই মূলনীতিকেই সামনে এনে দেয়। ওয়েইসি আরও বলেন, “আমরা হয়তো তখন থাকব না, আমাদের শরীরের হাড়গোড় মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। কিন্তু সেই দিন অবশ্যই আসবে।” এই আবেগঘন ভাষা তার সমর্থকদের মধ্যে যেমন উদ্দীপনা তৈরি করেছে, তেমনি বিরোধীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়াও জন্ম দিয়েছে।
বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ করে ওয়েইসি বলেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, তা চিরস্থায়ী নয়। “ইনশাল্লাহ , এই ঘৃণা বেশি দিন টিকবে না। যারা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তারাই একদিন শেষ হয়ে যাবে। ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়লে তারা বুঝতে পারবে, কতটা ঘৃণা তারা মানুষের মনে ঢুকিয়েছিল।
এই বক্তব্যের পরপরই বিজেপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। দলের সাংসদ অনিল বোন্দে ওয়েইসির মন্তব্যকে “দায়িত্বজ্ঞানহীন” আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি অর্ধসত্য তুলে ধরছেন। বোন্দের বক্তব্য অনুযায়ী, “অনেক মুসলিম নারীই হিজাব প্রথার বিরুদ্ধে। ইরানের নারীরাই এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। কারণ কেউ পরাধীনতা চায় না।” বিজেপির মতে, হিজাবকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করে ওয়েইসি ধর্মীয় বিভাজন উসকে দিচ্ছেন।
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারতে হিজাব, ইউনিফর্ম ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আগেও একাধিক আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে। কর্ণাটকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নকে বারবার সামনে এনেছে।
সব মিলিয়ে, “হিজাব পরা নারীই একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন”—এই বাক্যটি এখন শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয় বরং ভারতের গণতন্ত্র, সংবিধান, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নারীর নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর এক বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, ওয়েইসির এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে, এবং তা ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্ম ও অধিকার নিয়ে চলমান টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
Leave a comment