ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এক ইরানি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। নিহত ব্যক্তির নাম আলী আরদেস্তানি। বুধবার দেশটির বিচার বিভাগীয় বার্তা সংস্থা মিজান নিউজ এজেন্সির বরাতে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, আলী আরদেস্তানি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে তা ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কাছে সরবরাহ করেছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, এ তথ্য পাচারের বিনিময়ে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির মামলা দায়ের করা হয়।
ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, তদন্ত ও একাধিক শুনানির পর আদালত আলী আরদেস্তানিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তার কর্মকাণ্ড দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক স্থাপনার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রচলিত আইনের আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়, যা বুধবার কার্যকর করা হয়েছে।
এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের জুনে দুই দেশের মধ্যে সংঘটিত ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর থেকে ইরান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ওই সংঘর্ষে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে, যা তেহরানের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
এরপর থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি ও বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আলী আরদেস্তানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকে সেই কঠোর নীতিরই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
তবে এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। নরওয়ে-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর) অভিযোগ করেছে, এই মামলায় ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি।
সংস্থাটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এক বিবৃতিতে বলেন, জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করেই রায় ঘোষণা করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ইরানে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন অতীতেও ইরানের মৃত্যুদণ্ড নীতির সমালোচনা করেছে, যদিও তেহরান বরাবরই এটিকে অভ্যন্তরীণ আইনগত বিষয় বলে দাবি করে আসছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়, তার পর এই প্রথম গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বহিরাগত হুমকির আশঙ্কা—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই সরকার কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি নতুন করে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা উসকে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, আলী আরদেস্তানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ইরানের বর্তমান নিরাপত্তা নীতি, আঞ্চলিক সংঘাত এবং মানবাধিকার বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। সামনে এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a comment