ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৬ জনে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই বিক্ষোভকারী এবং তাদের কয়েকজনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ ছাড়া সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ৬০ জন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ।
এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ২৭টিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির ৯২টি শহরের শতাধিক স্থানে একযোগে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তবে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত হতাহত কিংবা গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই বিক্ষোভের সূচনা হয় গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে। সে দিন ইরানের মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট শুরু করেন। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখে নেমে আসা এবং মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্রথমে ব্যবসায়ী ও বাজারকেন্দ্রিক প্রতিবাদ শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এতে শিক্ষার্থী, তরুণ ও সাধারণ মানুষ যুক্ত হন। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ একত্রিত হয়ে এই আন্দোলনকে স্পষ্টভাবে সরকারবিরোধী রূপ দেয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও সহিংস করে তুলেছে বলে অভিযোগ করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং গুলির ব্যবহার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এর জেরে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
বিক্ষোভ চলাকালে অনেক জায়গায় সরকার ও ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা গেছে আন্দোলনকারীদের। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের গভীর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করবে। তার এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে দমনের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সুরে বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেই জানান, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে যারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তাদের কথা শোনা হবে; তবে অরাজকতা ও সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনের পর ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। সেই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি সেই ক্ষোভেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নিহত ও গ্রেপ্তারের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের বাইরে আরও বেশি হতে পারে। তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও ইন্টারনেট সীমিত করার অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সূত্র: বিবিসি
Leave a comment