রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসৃষ্টির অনন্য প্রেরণাস্থল আজও ছড়ায় সংস্কৃতির সুবাস। কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের খোরেশদপুর গ্রামে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়
—এটি বাঙালি সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক, এক অমর স্মৃতিচিহ্ন। কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের এই শান্ত পরিবেশে কবিগুরু কাটিয়েছেন তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানেই সৃষ্টি হয়েছে গীতাঞ্জলি’র অমর সব কবিতা, যা তাঁকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার—বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য এক ঐতিহাসিক সম্মান।
পদ্মা-গড়াইয়ের নৈসর্গিক প্রেরণা
ঠাকুর পরিবারের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বে এসে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছিলেন শিলাইদহের প্রকৃতিতে। চারপাশে পদ্মা ও গড়াই নদীর শান্ত সৌন্দর্য, সবুজে ঘেরা নিভৃত পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনের অনুপ্রেরণা। এখানেই তিনি রচনা করেন গীতাঞ্জলি, গোরা, চোখের বালিসহ অসংখ্য অমূল্য সাহিত্যকর্ম।
কুঠিবাড়ির স্থাপত্য ও জাদুঘর
বর্তমানে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি একটি সংরক্ষিত জাদুঘর। তিনতলা ভবনের তৃতীয় তলায় ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখার ঘর, যার লাগোয়া বারান্দা ও ছাদ থেকে কবি উপভোগ করতেন সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও জ্যোৎস্না।
নিচের ১৬টি কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর জীবনের নানা সময়ের ছবি, ব্যবহৃত আসবাবপত্র, বই, ও দুটি স্পিডবোট—‘চঞ্চলা’ ও ‘চপলা’। আরও দেখা যায় কবির খাট, পালকি, খাজনা আদায়ের চেয়ার-টেবিল, হাতে লেখা চিঠিপত্র ও নিজ হাতে আঁকা চিত্রকর্ম। পশ্চিম পাশে রয়েছে বকুলতলা পুকুর ঘাট, যেখানে কবি প্রায়ই নির্জনে সময় কাটাতেন।
দর্শনার্থী –
প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে কুঠিবাড়ি। পহেলা বৈশাখ, ২৫ বৈশাখের রবীন্দ্রজয়ন্তী, বিজয় দিবস ও অন্যান্য উৎসবে এখানে আয়োজন করা হয় গান, আবৃত্তি ও নাট্যানুষ্ঠানের। স্থানীয় দোকানগুলোতে বিক্রি হয় পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প, রবীন্দ্রনাথের ছবি ও উদ্ধৃতিসংবলিত টি-শার্ট, বই ও স্মারক। পাশেই গড়ে উঠেছে হোটেল ও রেস্তোরাঁ—যেখানে কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি মালাই ও তিলের খাজা দর্শনার্থীদের প্রিয় খাবার। দর্শনার্থীর ভাষায়, “এখানে এলে রবীন্দ্রনাথ যেন মনের খুব কাছে চলে আসেন। তাঁর সাহিত্য শুধু পড়া নয়, অনুভব করার বিষয় হয়ে ওঠে।”
কুষ্টিয়ার অন্যান্য ঐতিহাসিক গন্তব্য-
রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ির পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় রয়েছে লালন শাহের মাজার ও আখড়া, মীর মশাররফ হোসেনের লাহিনীপাড়া, এবং কুমারখালীর কাঙাল হরিনাথ জাদুঘর। এ ছাড়া পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সাহিত্যকেন্দ্রগুলোও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
ভ্রমণ তথ্য-
কুষ্টিয়া শহর থেকে কুঠিবাড়ি যেতে সময় লাগে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট।
• গ্রীষ্মকালীন সময়সূচি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা
• শীতকালীন সময়সূচি: সকাল ৯টা–বিকেল ৫টা
• দুপুরে বিরতি: ১টা–১টা ৩০ মিনিট
• শুক্রবার বন্ধ: ১২টা ৩০–৩টা (জুমার নামাজের জন্য)
• সাপ্তাহিক বন্ধ: রবিবার পূর্ণদিন, সোমবার দুপুর পর্যন্ত
প্রবেশমূল্য:
• প্রাপ্তবয়স্ক: ২০ টাকা
• শিক্ষার্থী: ৫ টাকা
• সার্ক দেশ: ৫০ টাকা
• অন্যান্য বিদেশি: ১০০ টাকা
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি শুধু রবীন্দ্রনাথের বাসভবন নয়—এটি বাঙালি জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক পবিত্র প্রতীক। এখানে এসে মনে হয়, পদ্মার বাতাসে আজও ভেসে আসে তাঁর কবিতার ছন্দ, তাঁর গানের সুর—“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”
Leave a comment